Skip to main content

মুক্ত নাটক: জনগণের নাটক



বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনে নাট্যচর্চার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিকভাবেই এই অঞ্চলে নাটক কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং ছিল সামাজিক অসঙ্গতি ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।

 

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা অর্জনের পর, মুক্ত পরিবেশে এই শিল্পমাধ্যম এক নতুন গতি লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং সদ্য স্বাধীন দেশের অস্থির রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে 'গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন', যা বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে পেশাদারিত্ব ও সমাজ-সচেতনতার এক নতুন দিগন্তে নিয়ে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় আশির দশকে যখন স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে, তখন নাট্যচর্চা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর তাগিদে জন্ম দেয় 'মুক্ত নাটক' আন্দোলনের। বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় নব্য রূপে আধুনিক ও গতিশীল রূপটি বিকশিত হয়েছে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর। যদিও উনিশ শতক থেকেই এ অঞ্চলে নাটকের চর্চা শুরু হয়েছিল, তবে স্বাধীনতার পর এটি কেবল শখের বিনোদনের স্তর থেকে উঠে এসে সমাজ-বদলের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। পরবর্তীকালে, আরণ্যক, থিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার সহ অসংখ্য নাট্যদল এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন এই আন্দোলনকে সুসংগঠিত করে। এই চর্চায় একদিকে যেমন ইউরোপীয় নাট্যরীতির প্রভাব দেখা যায়, তেমনি সেলিম আল দীন প্রমুখের হাত ধরে বাংলার ঐতিহ্যবাহী দেশজ আঙ্গিকের পুনরুজ্জীবন ঘটে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশের নাট্যচর্চা হলো আদর্শবাদী ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এক শিল্পরূপ, যা আজও দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

 

সাম্প্রতিক ‘রূপালী বাংলাদেশ’ এর মতামত কলামে নাট্যকার, নির্দেশক ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মলয় ভৌমিক ‘বিকল্পের সন্ধানে মুক্তনাটক আন্দোলন’ শিরোনামে লিছেখেন, “নাটকের মাধ্যমে শ্রেণিবৈষম্য দূর করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই মামুনুর রশীদের হাতে আরণ্যক নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা হয়েছে।... কিন্তু প্রসেনিয়াম-ঘেঁষা নগরকেন্দ্রিক এই নাট্যদলগুলোর মাধ্যমে যে তার আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, এটা বুঝতে তার সময় লাগে না। তিনি বিকল্প অনুসন্ধান করতে থাকেন এবং এক সময়ে বিকল্প পেয়েও যান। তার সেই বিকল্পের নাম ‘মুক্তনাটক’।” (https://www.rupalibangladesh.com/opinion/18641)

 

বাংলা নাটকের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ‘মুক্ত নাটক’। মূলত শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নগরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার চিরায়ত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে নাট্যকর্মীরা বৃহত্তর শ্রমজীবী এবং কৃষিজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।

 

আরণ্যক নাট্যদলের নেতৃত্বে ১৯৮১ মতান্তরে ১৯৮৪ সালে এই ‘মুক্ত নাটক আন্দোলন’ সূচনা হয়। এই আন্দোলনের বিশেষত্ব হলো, গ্রামের সাধারণ মানুষ— যারা দীর্ঘদিন ধরে সমাজের উচ্চবর্গের দ্বারা শোষিত হয়ে আসছে— তারাই নিজেদের জীবনের গল্প, বঞ্চনা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে নাটক তৈরি করে এবং তা গ্রামের মানুষের সামনেই মঞ্চস্থ করে। এর ফলস্বরূপ, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ তাদের নিজেদের শ্রেণিগত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং সমাজে বিদ্যমান শোষণ ও বৈষম্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করে। এটি ছিল নাটকের মাধ্যমে সামাজিক জাগরণ সৃষ্টির এক শক্তিশালী প্রয়াস।

 

 

আশির দশকে(১৯৮০-এর দশকে) বাংলাদেশে স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়েই একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক আন্দোলনও সমান্তরালভাবে বিকশিত হচ্ছিল।

 

এই পটভূমিতেই ঢাকার আরণ্যক নাট্যদলের প্রধান, নাট্যকার, অভিনেতা ও নাট্য পরিচালক মামুনুর রশীদ দেশজুড়ে 'মুক্ত নাটকের' ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। মুক্ত নাটকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, সমাজের সাধারণ মানুষ তাদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা ও ঘটনা নিয়ে নিজেরাই নাটক তৈরি করবে। নাট্যকর্মীরা কেবল তাদের এই সৃজনশীল কাজে সহযোগিতা করবে।

 

মুক্ত নাটকের স্লোগান,

"জনগণের মধ্য থেকে, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য মুক্ত নাটক"

উক্ত স্লোগান বিচারে দেখা যায় যে, প্রথম অংশ— "জনগণের মধ্য থেকে"— অর্থাৎ নাটকের উৎস নির্দেশ করে। মানে নাটকের বিষয়বস্তু বা থিম কোনো কাল্পনিক জগৎ থেকে বা অভিজাত শ্রেণীর অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া হবে না, বরং তা সরাসরি উঠে আসবে গ্রামীণ ও শ্রমজীবী সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবন, তাদের দৈনন্দিন সংগ্রাম, দুঃখ-দুর্দশা এবং বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থেকে।

দ্বিতীয় অংশ— "জনগণের দ্বারা"— মুক্ত নাটকের কার্যনির্বাহী প্রক্রিয়াটি স্পষ্ট করে এই অংশ। অর্থাৎ নাটকটি কেবল পেশাদার নাট্যকর্মীরা তৈরি বা পরিবেশন করবেন না, বরং যে সাধারণ মানুষ শোষণের শিকার, তারাই নিজেদের গল্প নিয়ে, নিজেদের উদ্যোগে নাটক তৈরি ও মঞ্চস্থ করার প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত হবে। অবশ্য নাট্যকর্মীরা এখানে কেবল সহায়ক বা পরামর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল।

সর্বশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো— "জনগণের জন্য"। অর্থাৎ মুক্ত নাটকের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উপকারভোগীকে চিহ্নিত করে। এই নাটকের উদ্দেশ্য নিছক বিনোদন নয়, বরং শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের জন্য একটি সচেতনতামূলক মঞ্চ তৈরি করা। নাটকটি তাদের সামনে নিজেদের শ্রেণিগত অবস্থান, শোষণ ও মুক্তির পথ স্পষ্ট করে তুলে ধরার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সচেতনতা ও ঐক্য তৈরি করতে কাজ করে।

...

'মুক্ত নাটক' আন্দোলন বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। এটি প্রমাণ করে যে নাটক শুধুমাত্র একটি শিল্প নয়, বরং সামাজিক অন্যায়, বৈষম্য এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সক্ষম প্রতিবাদের হাতিয়ার হতে পারে।

 

 

মুহাম্মদ আল ইমরান

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Comments