Skip to main content

ঢাকার নাট্যচর্চা - মুহাম্মদ আল ইমরান



শিরোনাম: ঢাকার নাট্যচর্চা

লেখক: মুহাম্মদ আল ইমরান

 

আমাদের নদীমাতৃক দেশ, কৃষিপ্রধান একটি দেশ। এদেশের কৃষক চাষাবাদ করতে গিয়ে গান গায়। উঠোনে ধান উঠলে জমে ওঠে আসর। সারাদিন কষ্টের পরে রাতের শান্তি খুঁজে কিস্সা, পালা আরও কত কিছু দিয়ে। "১৯৫১ সালে রূপশ্রী, 'দুই পুরুষ' নাটকটি মঞ্চস্থ করার জন্য সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হল তিন রাত্রির জন্য ভাড়া নেওয়া হয়। সেখানে তৎকালীন গভর্নর ফিরোজ খাঁ নুন বলেছেন, "East Bengal is Fertile in Culture then Agriculture." অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ কৃষির চেয়ে কৃষ্টির ক্ষেত্রে অধিকতর উর্বর।" ফিরোজ খাঁ নুন সাহেবের কথায় উঠে আসে - কৃষির চেয়েও সাংস্কৃতিক দিকে আমাদের দৃঢ় অবস্থানের কথা। এই আলোচনায় বলব ঢাকার নাট্যচর্চার কথা। সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো নাটকও একটি তাৎপর্যপূর্ণ শাখা। 'নট্' শব্দটি মূল ধরে পাওয়া যায় নাট্য, নাটক, নট, নটী এই সকল শব্দ। 'নট্' মানে নড়াচড়া করা। নাট্যের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো Drama, যা গ্রিক Dracin থেকে এসেছে। এর অর্থ To Do কিংবা কোনো কিছু করা। বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্যের শুরু থেকে নাটকের একটি পথ তৈরি হয়েছে। অবশ্য এই পথে রয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের অস্তিত্ব কিংবা বিদেশিদের প্রভাব। একদিকে যেমন নাটক প্রকাশিত হয়েছে, অন্যদিকে মঞ্চস্থ হয়েছে। তবে নাটকের ইতিহাস তৈরি হতে ভৌগোলিক অবস্থানের প্রভাব লক্ষণীয়।

 

১৭৫৭ সালের ২৩শে জুন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন এবং ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন শুরু হয়। ফলে পথ সূচিত হয় ব্রিটিশ শাসনের। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন ব্রিটিশ রাজ বা রানি ভিক্টোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করে। তখন থেকে ব্রিটিশ শাসনের অন্তর্গত হয় ভারতীয় উপমহাদেশ, যা ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। এ সময়ে পুরান ঢাকায় নাট্যচর্চার এক অদম্য ধারা চলতে থাকে।

 

ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশে এসে তাদের অবসর বিনোদনের জন্য তৈরি করেন - ওল্ড প্লে হাউজ (প্রতিষ্ঠা ১৭০০ পরবর্তী সময়ে), দি নিউ ওল্ড প্লে হাউজ বা ক্যালকাটা থিয়েটার (প্রতিষ্ঠা ১৭৭৫) সহ আরও অসংখ্য নাট্যশালা। ১৭৯৫ সালে রাশিয়ান ভদ্রলোক গেরাসিম স্তেপানোভিচ লেবেদেফ ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় আসেন। কলকাতায় ২৫ নম্বর ডোমতলার (এজরা স্ট্রিট) একটি বাড়িতে "দ্য বেঙ্গলি থিয়েটার" নামে থিয়েটার গড়ে তোলেন। যেখানে দ্য ডিজগুয়িজ (The Disguise) এর অনুবাদ 'কাল্পনিক সংবদল' মঞ্চস্থ করেন ১৭৯৫ সালের ২৭শে নভেম্বর। “উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকেই এদেশে রঙ্গালয় ও নাটক পারস্পরিক সম্পর্কায়িত হয়েই এগিয়ে চলেছে। লেবেডেফকে সমকালীন 'মঞ্চব্যবস্থা' এবং বিশেষ করে অভিনেতা-অভিনেত্রী ও দর্শকদের কথা বিচার করেই নাট্যরূপ অভিনয়ের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।” ভিন্ন ভাষার নাটক বাংলায় অনুবাদ করার সূচনা বোধ হয় লেবেদেফ ও সমকালীন নাটকের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের থেকেই শুরু হয়েছে। এখনও দেশের বিভিন্ন মঞ্চে বিভিন্ন ভাষার নাটক বাংলায় অনুবাদ করে মঞ্চস্থ হতে দেখা যায়। আবার একই মঞ্চে দুই ভাষায় নাটক হয়। অনুবাদ সাহিত্যের আলোচনায় এ বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে।

 

ব্রিটিশদের থিয়েটার মূলত ছিল তাদের অবসর বিনোদনের জন্য। তাই এসব থিয়েটার গড়ে উঠত তাদের বসবাসের অঞ্চল কেন্দ্র করে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য মতে, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি “১৬৬৮ সালে বাংলার রাজধানী ঢাকায় একটি করে নতুন ফ্যাক্টরি স্থাপন করে।” যেহেতু ঢাকায় ১৬৬৮ সালে কোম্পানির ফ্যাক্টরির কথা পাওয়া যায়, সেহেতু তাদের অবস্থান কেন্দ্র করে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ১৬৬৮ সাল থেকে নাটক মঞ্চস্থ হয়ে থাকতে পারে। কেননা কলকাতায় ইংরেজদের নাটক মঞ্চস্থের বেশ তথ্য বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। বলে রাখা ভালো যে - আগত বহিরাগতদের নির্মিত নাট্যমঞ্চের আগে বাংলায় নাটক অভিনীত হত মুক্তমঞ্চে, যা নাটমন্দির নামে পরিচিত। বাংলা নাটকের শুরুতে অনেক বড় একটা স্থান দখল করে আছে যাত্রা। যাত্রার সঙ্গে যেমন আছে বাঙালিয়ানা, তেমনি নিজস্বতা। গ্রামের কোনো উৎসব আয়োজনে উন্মুক্ত স্থানে কিংবা আসরে বহু মানুষের সমাগমে যাত্রা অভিনীত হত। যাত্রা নিয়ে পৃথক আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। ব্রিটিশদের নির্মিত নাট্যমঞ্চে সাধারণরা নাটক দেখার কোনো সুযোগ পেত না। তবে সাধারণের জন্য যে একেবারে কোনো নাট্য ছিল না, তা বলা যায় না। হয়তো আমাদের নিজস্ব নাট্যরূপ এই চাহিদা মেটাত।

 

এবার ঢাকার দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। মূলত পূর্বোক্ত কথা বলা প্রসঙ্গত। কেননা ব্রিটিশ রাজের শাসনের সময় ঢাকা ছিল ভারতবর্ষের অংশ। সেক্ষেত্রে উভয় অংশের ইতিহাস কাউকে বাদ দিয়ে হয় না। উনিশ শতকের শেষভাগে ঢাকায় কয়েকটি নাট্যমঞ্চ নির্মিত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় - পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি (১৮৬০ পরবর্তী), ক্রাউন থিয়েটার মঞ্চ (১৮৯০-৯২ এর মধ্যে), ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার (১৮৯৭) ইত্যাদি।

 

পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি ১৮৬৫ সালে (মতান্তরে ১৮৭০-৭২ সালের মধ্যে) পুরান ঢাকায় বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে জমিদার মোহিনীমোহন দাসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এর নির্দিষ্ট অবস্থান জানা না গেলেও অনুমান করা হয় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও ব্রাহ্ম সমাজ মন্দির মধ্যবর্তী অবস্থানে হতে পারে। পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি কেন্দ্র করে একটি নাট্যসমাজও গড়ে উঠেছিল। ১৮৭২ সালে ‘রামাভিষেক’ নাটক মঞ্চায়নের মাধ্যমে এই রঙ্গমঞ্চই ঢাকায় প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যাভিনয় শুরু করে। টিকেটের হার ছিল চার, দুই ও এক টাকা, যা সময়ের বিবেচনায় ছিল অনেক বেশি।

 

যেখানে বরিশালের মতো মফস্বল শহরে ১৮৫৫-১৮৬৯ সালের মধ্যে ডাঃ দুর্গাদাস কর রচিত স্বর্ণশৃঙ্খল নাটক অভিনীত হয়। ঢাকা প্রকাশের এক সংবাদে পাওয়া যায়, ডাঃ দুর্গাদাস করের সহকারী “বৃন্দাবনচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৬৩ সনের জুলাই মাসে ঢাকায় নাটকখানি মুদ্রিত করেন। তিনি ‘বিজ্ঞাপন’ পত্রে লিখিয়াছিলেন - প্রায় আট বৎসর অতীত হইল কতিপয় সহৃদয় বন্ধুর অনুরোধে অভিনয় করিবার নিমিত্ত বরিশালে এই নাটক লিখিত হয়।”

উক্ত সংবাদে বলা হয়েছে ১৮৬৩ সালে নাটকটি মুদ্রিত হয়। যাতে বিজ্ঞাপন অংশে লেখা আছে প্রায় ৮ বছর আগে অভিনয়ের জন্য নাটকটি লেখা হয়। তাহলে বলা যায় ১৮৫৫ সালের দিকে বরিশালে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। তখন বেশি দর্শক হবে বিধায় টিকেটেরও ব্যবস্থা করা হয়। ঢাকা প্রসঙ্গ পূর্বে উল্লেখ করেছিলাম 'রামাভিষেক' নাটক ছিল পূর্বরঙ্গ রঙ্গভূমিতে প্রথম প্রদর্শনীর বিনিময় নাটক। এই যুক্তি ধরে অনেক তাত্ত্বিক বলে থাকেন ১৮৭২ সালে পূর্বরঙ্গ রঙ্গভূমি প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু বরিশালে এর আগে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেটা যে উপলক্ষে হোক না কেন! ঢাকায় তারও আগে প্রদর্শনীর বিনিময় নাটক হয়ে থাকতে পারে। অবশ্য কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্যসূত্র হাতের নাগালে পেলাম না। মূলত পূর্বরঙ্গ রঙ্গভূমি প্রতিষ্ঠার সাল নিয়েই মতবিরোধ রয়েছে। "ঢাকাতে দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটক মঞ্চস্থ হয় ১৮৬১ সালে।"

“১৮৬৫ সালে পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি আট হাজার টাকা চাঁদা উঠিয়ে সংস্কার করা হয়।” অর্থাৎ পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি ১৮৬৫ সালেরও অনেক আগে প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি ১৮৬১ সালে পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি থাকে, তাহলে দীনবন্ধু মিত্রের 'নীলদর্পণ' নাটক সেখানেই মঞ্চস্থ হয়েছে। বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠী পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি ভাড়া নিয়ে অভিনয় করত। ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে যেমন সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের অবদান বা ভূমিকা রয়েছে, তেমনি ঢাকার নাটকের কথা বলতে গেলে তাদের কথা চলে আসবে। ইতিহাসে কার অবদান বা ভূমিকা কম কিংবা বেশি, সেই তর্কে যাব না। অন্যান্য পরিবারের মধ্যে নবাব বাড়ির কথা না বললেই নয়। নবাব বাড়ির প্রসঙ্গে আমার শিক্ষক, ক্যাথরিন পিউরীফিকেশন ম্যাডাম “ঢাকার নবাব বাড়ির নাট্যচর্চা” প্রবন্ধে লিখেছেন, “ঢাকার স্থায়ী রঙ্গমঞ্চ পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমিতেও নবাবদের আমন্ত্রিত নাট্যদলগুলো অভিনয় করত।” এছাড়াও মোহিনীমোহন দাসের পৃষ্ঠপোষকতায় ১৮৭৩ সালের দিকে কলকাতার হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটার ঢাকায় এসে পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমিতে নীলদর্পণ, নবীন তপস্বিনী, সধবার একাদশী, যেমন কর্ম তেমন ফল, বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ, ভারত মাতা ইত্যাদি নাটক মঞ্চস্থ করে। ১৮৭৬ সালে নবাব আবদুল গনির আমন্ত্রণে মুম্বাই থেকে একটি দল ঢাকায় এসে গন্নুবাঈ, আন্নুবাঈ ও নবায়ন এই তিনবোন হিন্দি নাটক ইন্দ্রসভায় অভিনয় করেন। কিছু কিছু প্রবন্ধে এটিকে ঢাকায় নারীদের দ্বারা অভিনীত প্রথম নাটক হিসেবে উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বিবেচনায় এক ইতিহাস যেন রচনা হয়েছিল। কিন্তু ব্রাহ্ম সমাজের অবস্থানের কথা ভাবলে বলতে হয় আরও আগে থেকে নাটকে নারীদের অভিনয় ঢাকায় হয়েছিল। তা না হলে ব্রাহ্ম সমাজের একাংশ নাট্য বিরোধী ছিল এই কারণে যে তখন নাটকে নারীরা অভিনয় করত বলে। সত্যেন সেন লিখেছেন, “পতিতা মেয়েরা থিয়েটারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকত বলেই তারা থিয়েটারকে বর্জনীয় বলে মনে করতেন।” পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি টাউন হলের প্রয়োজন মিটিয়েছে। এখানে ঢাকার অধিকাংশ সভা অনুষ্ঠিত হতো, শুধু নাটকই প্রদর্শিত হতো না।

 

ক্রাউন থিয়েটার মঞ্চ ১৮৯০ থেকে ১৮৯২ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথমে ছিল ‘পূর্ববঙ্গ রঙ্গভূমি’ নাট্যগোষ্ঠীর মঞ্চ; কিন্তু এই গোষ্ঠীর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে ক্রাউন থিয়েটার সেটি ভেঙে নতুন করে মঞ্চ নির্মাণ করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আপত্তির কারণে মঞ্চটি এক সময় ইসলামপুরে স্থানান্তরিত হয়।

 

কলকাতা থেকে বেশ কিছু নাটকের দল ঢাকায় এসে অভিনয় করত। ফলে এর প্রভাব পড়তে শুরু করে ঢাকার নাট্য ইতিহাসে। “নাটকের এই চমৎকারিত্বে মুগ্ধ ও উৎসাহিত হয়ে জুবিলী স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা কিশোরীলাল রায় চৌধুরী ১৮৮৭ সালে মহারানী ভিক্টোরিয়ার রাজ্য শাসনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘ডায়মন্ড জুবিলী থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা করেন।” উল্লেখ্য যে, সত্যেন সেন তার লেখায় ১৮৮৭ সালের কথা বলেছেন। কিন্তু ১৮৩৭ সালের ২০শে জুন মহারানী ভিক্টোরিয়া সিংহাসনে বসেন, এবং এই হিসেবে ১৮৯৭ সালে তার শাসনের ৬০ বছর পূর্ণ হয়। আবার তখনকার সংবাদপত্রে উঠে আসে ক্রাউন থেকে অভিনেতা অভিনেত্রী নিয়ে ডায়মন্ড থিয়েটারের সূচনা। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন লিখেছেন, “১৮৯৭ সালে, বালিয়াটির জমিদার কিশোরী লাল রায় চৌধুরী, ক্রাউন থেকে কিছু অভিনেতা নিয়ে, ক্রাউনের প্রতিদ্বন্দ্বী স্বরূপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডায়মন্ড জুবিলী।”১০ পুরান ঢাকার ইসলামপুরে নবাব বাড়ির গেটের নিকটে, অর্থাৎ সাবেক লায়ন সিনেমা হলের জায়গায় মঞ্চটি নির্মিত হয়েছিল। ক্রাউন থিয়েটারের কতিপয় অভিনেতা-অভিনেত্রী ‘ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটারে’ যোগ দেয়ার ফলে ক্রাউন থিয়েটারের কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিছুকাল পরে ক্রাউন থিয়েটার চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু করলে নাট্যমঞ্চ হিসেবে এর অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়।

 

ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার কলকাতা থেকে অভিনেত্রী এনে ও স্থানীয় বাইজিদের দিয়ে অভিনয় করাত। ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটারের মঞ্চে অভিনীত উল্লেখযোগ্য নাটকগুলি হলো: দুর্গেশনন্দিনী, দেবীচৌধুরানী, বিজয় বসন্ত, আলীবাবা, নবীন তপস্বিনী, বিল্বমঙ্গল, নন্দদুলাল, তরুবালা ইত্যাদি। টিকেটের হার ছিল দুই টাকা, এক টাকা, আট আনা ও চার আনা। ঢাকায় পেশাদার থিয়েটার প্রচলনের পেছনে ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটারের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল।১১

”বিশ শতকের প্রথম দিকে মীর্জা আবদুল কাদের ডায়মন্ড জুবিলি থিয়েটার ক্রয় করে এর নতুন নামকরণ করেন লায়ন থিয়েটার।“১২ বাংলা নাটকের পাশাপাশি উর্দু নাটকও মঞ্চস্থ হত। ঢাকায় ফিল্মের আবির্ভাবে লায়ন থিয়েটারে নাটক প্রদর্শন বন্ধ করে ‘লায়ন সিনেমা’ নামে প্রেক্ষাগৃহে পরিণত করা হয়। তবে ঢাকার নাটকে উক্ত নাট্যমঞ্চ বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

 

"ইসলামপুরের যেখানে 'লায়ন সিনেমা' কাদের সর্দার ওখানে 'পাসিয়ান থিয়েটার' নামে একটি নাট্যশালা প্রতিষ্ঠা করেন।"১৩ থিয়েটারের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের সূচনালগ্নে সৌখিনতার আবরণে সুপ্ত ছিলো। গ্রামের একটা প্রবাদ আছে, "শখের তোলা আশি টাকা।" শখের জন্য মানুষ যে কাজ করে তাতে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করতে পারে। থিয়েটারে একটা সময় শখের প্রাধান্য পায়।

রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য-বিভাগের অধ্যাপিকা ড. গীতা সেনগুপ্ত তার "বিশ্বরঙ্গালয় ও নাটক" গ্রন্থে 'নবনাট্য আন্দোলন ও আধুনিক যুগ' শিরোনামে লিখেছেন, "বাংলা থিয়েটারের প্রথম যুগ কেটেছে নবজাগরিত শিক্ষিত অভিজাত বাঙ্গালীদের সৌখিন নাট্যাভিনয় প্রচেষ্টায়।"১৪ কলকাতার মতো ঢাকায়ও সূচনা হয়েছিল সৌখিন নাট্যপ্রচেষ্টা দিয়ে। তবে কেউ কেউ ব্যবসায়িক দিক চিন্তা করে নাট্যচর্চা করত।

 

তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশে নিয়মিত নাট্যচর্চা ছিল না। বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও পর্ব উপলক্ষে নাটক মঞ্চস্থ হত। "মাওলানা বক্স সর্দার ও সামাদ মেম্বারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মঈনদ্দিন চৌধুরী মেমোরিয়াল মিলনায়তন প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তাদের উৎসাহ, অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতা পেয়ে পুরান ঢাকায় নাট্যচর্চার উন্মেষ ঘটে।"১৫

"লালবাগ কম্যুনিটি সেন্টার হল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট মিলনায়তনে নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হত। বাংলাদেশের মফঃস্বলের অনেক নাট্য গোষ্ঠী এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়।"১৬ পুরান ঢাকায় নাট্য গোষ্ঠীর নামের সাথে সৌখিন শব্দ যোগ নির্দেশ করে সৌখিন থিয়েটারকে। "মরহুম এজাজ খানের নেতৃত্বে পুরান ঢাকায় বাংলাদেশ সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী ফেডারেশন গঠিত হয়।"১৭

এছাড়াও বেশ কিছু সৌখিন নাট্য গোষ্ঠীর নাম জানা যায়, বালার্ক সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী, একতা সৌখিন শিল্পী গোষ্ঠী, অপরূপ সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী, আনন্দম সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী, মঞ্চদূত সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী, পথিকৃৎ সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী, বিবর্তন সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী ইত্যাদি।

 

পরিশেষে, সৌখিন কিংবা পেশাদার অথবা অধিকার আদায়ের জন্য নাটক! যা কিছু হোক না কেন, নাটক আমাদের কথা বলে। নাটকের নেপথ্যে যেমন গল্প থাকে তেমনই নাটক মঞ্চায়নের পর তৈরি হয় গল্প, সেই গল্পগুলো ঐতিহ্য নামক বৃক্ষের শিকড় তৈরি করে। যে শিকড় গড়ে উঠেছিল আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে। সৃষ্টিশীলতা আর ইতিবাচক মনন মিশে যাক আমাদের গল্পে ও থিয়েটারে— এভাবেই চলুক আমাদের শিল্পের জয়যাত্রা।

 

তথ্যসূত্র:

১. ওবায়দুল হক সরকার, পঞ্চাশ দশকের পত্র-পত্রিকায় " ঢাকার নাটক", পৃ. ২৬

২. দর্শন চৌধুরী, বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস, কলকাতা: পুস্তক বিপণি, ১৯৯৫, পৃ: ১২।

৩. সিরাজুল ইসলাম, বাংলাপিডিয়া।

৪. ঢাকা প্রকাশ, ঢাকা ১২৭০ সাল, ৩০ আষাঢ়। [সুকুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ও নাটকের ধারা, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৮, পৃ ২৩]

৫. সুকুমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের নাট্যচর্চা ও নাটকের ধারা, বাংলা একাডেমি, ১৯৮৮, পৃ. ৩

৬. মুনতাসির মামুন, উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের থিয়েটার ও নাটক, সময় প্রকাশন, ২০১৭, পৃ. ৩৭

৭. ক্যাথরিন পিউরীফিকেশন, ঢাকার নবাব বাড়ির নাট্যচর্চা, থিয়েটার স্টাডিজ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৯, পৃ. ১২৫

৮. ঢাকা শহরের নাট্য আন্দোলন, সত্যেন সেন রচনাবলি ৮ম খণ্ড

৯. ঢাকা শহরের নাট্য আন্দোলন, সত্যেন সেন রচনাবলি ৮ম খণ্ড

১০. মুনতাসির মামুন, উনিশ শতকে পূর্ববঙ্গের থিয়েটার ও নাটক, সময় প্রকাশন, ২০১৭।

১১. জিল্লুর রহমান জন, নাট্যমঞ্চ, বাংলাপিডিয়া।

১২. ওবায়দুল হক সরকার, পঞ্চাশ দশকের পত্র-পত্রিকায় " ঢাকার নাটক", পৃ. ২৫

১৩. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত "ঢাকা মহানগরীর নাট্যচর্চা", পৃ. ৫৫

১৪. গীতা সেনগুপ্ত, বিশ্বরঙ্গালয় ও নাটক, পৃ. ৬৫৫

১৫. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত "ঢাকা মহানগরীর নাট্যচর্চা", পৃ. ৫৬

১৬. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত "ঢাকা মহানগরীর নাট্যচর্চা", পৃ. ৫৮

১৭. বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত "ঢাকা মহানগরীর নাট্যচর্চা", পৃ. ৫৮



কৃতজ্ঞতা-

ক্যাথরিন পিউরীফিকেশন

সহকারী অধ্যাপক

নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।



প্রবন্ধ: ঢাকার নাট্যচর্চা।

লেখক-

মুহাম্মদ আল ইমরান

শিক্ষার্থী

নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Comments