Skip to main content

ক্যাথারসিস তত্ত্ব বিচারে মানসিক সুস্থতায় সাহিত্য পাঠ - মুহাম্মদ আল ইমরান

 

বর্তমান যুগে মানুষ যত প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, ততই যেন মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকীত্ব এবং হতাশার মতো সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। প্রতিদিনের ব্যস্ততা, প্রতিযোগিতা এবং অনিশ্চয়তার ভিড়ে নিজের ভেতরের মানুষটিকে সময় দেওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। এমন বাস্তবতায় সাহিত্য হতে পারে মানসিক সুস্থতা ও আত্মিক প্রশান্তির এক নির্ভরযোগ্য আশ্রয়।
‎সাহিত্য কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের অনুভূতি, চিন্তা, অভিজ্ঞতা এবং জীবনবোধের গভীর প্রকাশ। একটি নাটক, গল্প, কবিতা বা উপন্যাস পাঠের মাধ্যমে পাঠক অন্য মানুষের জীবন, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও আবেগের সঙ্গে পরিচিত হয়। ফলে নিজের দুঃখ-কষ্টকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি হয়। অনেক সময় যে অনুভূতিগুলো আমরা ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না, সাহিত্য সেগুলোকেই শব্দের মাধ্যমে আমাদের সামনে তুলে ধরে। এতে পাঠক নিজের ভেতরের আবেগকে চিনতে শেখে এবং মানসিক ভারসাম্য অর্জনে সহায়তা পায়।
‎দার্শনিক এরিস্টটল তার বিখ্যাত গ্রন্থ Poetics-এ ‘ক্যাথারসিস’ তত্ত্বের কথা উল্লেখ করেন। গ্রিক শব্দ Katharsis এর অর্থ হলো শুদ্ধিকরণ বা পরিশোধন। 'ক্যাথারসিস' তত্ত্ব নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা আছে। থিয়েটার, মনোবিজ্ঞান ও চিকিৎসাক্ষেত্রে বিশেষ ভাবে এর ব্যবহার আছে। এই শব্দ নিয়ে আমার আদর্শের বাতিঘরের সঙ্গেও আমার মতবিরোধ রয়েছে। যাইহোক প্রসঙ্গে আসি, এরিস্টটলের মতে, ট্র্যাজেডি দর্শকের মনে করুণা ও ভয়ের মতো আবেগ জাগিয়ে তোলে এবং পরিণামে সেই আবেগগুলোর পরিশোধন ঘটায়। অর্থাৎ শিল্প ও সাহিত্যের মাধ্যমে মানুষ তার অন্তর্গত আবেগকে প্রকাশ ও পরিশুদ্ধ করার সুযোগ পায়। ফলে মানসিক ভারমুক্তি ঘটে এবং ব্যক্তি এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করে। সে প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে মানুষের পরিশুদ্ধি বা মুক্তি ঘটে সেটাই ক্যাথারসিস।
‎এরিস্টটলের বিখ্যাত ক্যাথারসিস (Katharsis) তত্ত্বে মতে, শিল্প ও সাহিত্য মানুষের মনের জমে থাকা আবেগের পরিশুদ্ধি ঘটায় কিংবা পবিত্রকরণ করে। বিশেষ করে ট্র্যাজেডি বা বেদনাময় সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে মানুষের মনে করুণা ও ভয়ের মতো আবেগ জাগ্রত হয় এবং পরবর্তীতে সেই আবেগের একটি মুক্তি বা শুদ্ধিকরণ ঘটে। ফলে মানুষ সাহিত্য পাঠে মানসিকভাবে হালকা অনুভব করে এবং এক ধরনের প্রশান্তি লাভ করে। সাহিত্য পাঠের এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অতীত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
‎সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার, প্রতিযোগিতামূলক জীবনযাপন এবং ব্যক্তিগত সংকট অনেকের মনে উদ্বেগ ও অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে সাহিত্য পাঠ এক ধরনের মানসিক আশ্রয় হিসেবে কাজ করতে পারে। সাহিত্য পাঠের ক্ষেত্রেও ক্যাথারসিসের এই প্রক্রিয়া কার্যকর। একটি নাটক, উপন্যাস, কবিতা বা গল্পের চরিত্রের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম কিংবা বেদনার সঙ্গে পাঠক নিজেকে একাত্ম করে। যখন একজন পাঠক কোনো চরিত্রের দুঃখ, সংগ্রাম বা সাফল্যের গল্প পড়ে, তখন সে নিজের জীবনকেও নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শেখে, নিজের জীবনের সঙ্গে ঐ পাঠের মিল অমিল বা নিজেকে চরিত্র ভাবতে শুরু করে। মূল কথা চরিত্রের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পাঠক নিজের অনুভূতিগুলোকে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করে। অনেক সময় নিজের দুঃখ, হতাশা কিংবা একাকিত্বের প্রতিচ্ছবি সাহিত্যে খুঁজে পেয়ে মানুষ মানসিক স্বস্তি লাভ করে। এতে করে সাহিত্য তাকে সহমর্মী হতে শেখায়, সংকট মোকাবিলার সাহস দেয় এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। একই সঙ্গে বই পড়ার অভ্যাস মনোযোগ বৃদ্ধি করে, কল্পনাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে এবং মানসিক অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করে।
‎পরিশেষে, সাহিত্য কেবল জ্ঞানার্জন ও বিনোদনের অনুষঙ্গ নয়; এটি মানবমনের সুস্থতা, আবেগের পরিশুদ্ধি এবং আত্মিক বিকাশের এক অনন্য মাধ্যম। এরিস্টটলের ক্যাথারসিস তত্ত্বের আলোকে সাহিত্য পাঠ মানুষের অন্তর্গত বেদনা, সংকট ও অনুভূতিগুলোকে সৃজনশীলভাবে পরিশোধিত করে মানসিক ভারমুক্তি ও প্রশান্তি দান করে। সাহিত্য মানুষের হৃদয়কে সংবেদনশীল, চিন্তাকে গভীর এবং জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করে তোলে। বর্তমান ব্যস্ত ও চাপপূর্ণ সময়ে মানসিক সুস্থতা রক্ষার জন্য সাহিত্যচর্চা এক অপরিহার্য মানবিক অনুশীলন। তাই প্রতিদিনের জীবনে বইয়ের জন্য কিছু সময় বরাদ্দ রাখা মানে শুধু পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা নয়, বরং নিজের মনন, আবেগ ও আত্মাকে পরিচর্যা করা। সাহিত্য মানুষকে আরও সহনশীল, প্রজ্ঞাবান ও পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে এবং জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ও অর্থ উপলব্ধির পথে পথনির্দেশ করে।
‎লেখক: মুহাম্মদ আল ইমরান
‎বরিশাল, ৭ জুন ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ।


Comments