Skip to main content

ভরত নাট্যশাস্ত্রে রঙ্গালয়: চিত্র সহ বিকৃষ্ট মধ্যমের নির্মাণশৈলী - মুহাম্মদ আল ইমরান

 

ভরত নাট্যশাস্ত্রে রঙ্গালয়: চিত্র সহ বিকৃষ্ট মধ্যমের নির্মাণশৈলী

লেখক: মুহাম্মদ আল ইমরান

 

প্রাচীন ভারতবর্ষে আদিম যুগে কোনো স্থায়ী বা আবদ্ধ রঙ্গালয় ছিল না। নাট্যতাত্ত্বিকদের মতে, প্রাচীন নাট্য নিদর্শনের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট মঞ্চ নির্মাণ না করে উন্মুক্ত স্থানেই অভিনয় চলত, যার একটি সমকালীন উদাহরণ হলো বাংলার ঐতিহ্যবাহী ‘গীতরঙ্গ’ [১, পৃষ্ঠা ১৩]। ভরত মুনির মতে, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ এবং রাজবংশের পরিবর্তনের ফলে প্রাচীন নাট্যমঞ্চগুলো বিনষ্ট হয়েছে। তাই তিনি স্থায়ী ও শাস্ত্রীয় নিয়মে রঙ্গালয় নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন এবং নাট্যশাস্ত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়ে এর বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করেন [১, পৃষ্ঠা ১৩]

 

ভরত মুনি আকৃতি অনুসারে প্রধানত তিন ধরনের (ত্রিবিধ) রঙ্গালয়ের পরিকল্পনা করেছেন:

১. বিকৃষ্ট (আয়তাকার বা Rectangular)।

২. চতুরশ্র (বর্গাকার বা Square)।

৩. ত্র্যস্র (ত্রিকোণ বা Triangular) [১, পৃষ্ঠা ১৩, ২১]।

আবার আয়তন বা দৈর্ঘ্যের মাপ অনুযায়ী প্রতিটি প্রকারকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—জ্যেষ্ঠ (১০৮ হাত), মধ্য (৬৪ হাত) এবং অবর বা ক্ষুদ্র (৩২ হাত) [১, পৃষ্ঠা ১৩, ১৪, ২১]। অভিনবগুপ্তের মতে, জ্যেষ্ঠ রঙ্গালয় দেবতাদের জন্য এবং মধ্যম রঙ্গালয় রাজাদের জন্য নির্ধারিত, তবে মর্ত্যবাসী বা সাধারণ মানুষের নাট্যকার্যের জন্য ৬৪ হাত লম্বা ও ৩২ হাত চওড়া ‘মধ্যম বিকৃষ্ট’ রঙ্গালয়ই সর্বাপেক্ষা আদর্শ [১, পৃষ্ঠা ১৪, ২১, ২৩]

রঙ্গালয় নির্মাণের ক্ষেত্রে ভরত মুনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপের একক নির্ধারণ করেছেন। এই এককগুলো হলো—

৮ অণু = ১ রজ

৮ রজ = ১ বাল

৮ বাল = ১ লিখা

৮ লিখা = ১ যূকা

৮ যূকা = ১ যব

৮ যব = ১ অঙ্গুল

২৪ অঙ্গুল = ১ হস্ত (হাত)

৪ হস্ত = ১ দণ্ড [১, পৃষ্ঠা ২২]।

অতি বৃহৎ রঙ্গালয়ের অসুবিধা:

ভরত মুনির মতে, অতি বৃহৎ রঙ্গালয়ে নাট্য পরিবেশনা ফলপ্রসূ হয় না। কারণ অতি বৃহৎ স্থানে অভিনেতাদের মুখের ভাব (রস ও রাগ) দর্শকদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে পড়ে এবং কণ্ঠস্বর যথাযথভাবে ছড়িয়ে পড়ে না বা বিকৃত হয়ে যায়। ফলে দর্শকদের পক্ষে নাটকের সূক্ষ্ম রস আস্বাদন করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নাটক অভিনয়ের জন্য মধ্যম আকারের রঙ্গালয়ই সর্বাপেক্ষা উপযোগী, যেখানে কণ্ঠস্বর গম্ভীর ও সুমধুর শোনায় [১, পৃষ্ঠা ২৩, ৩৩]

ভূমি নির্বাচন ও শোধন:

রঙ্গালয় নির্মাণের প্রথম ধাপ হলো উপযুক্ত স্থান নির্বাচন। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী, রঙ্গালয়ের ভূমি হতে হবে সমতল, স্থির, শক্ত এবং সাদা বা কালো মাটিযুক্ত [১, পৃষ্ঠা ১৪, ২৪]। ভূমি নির্বাচনের পর তা লাঙল দিয়ে চাষ করে হাড়, পেরেক, ঘাস এবং অন্যান্য আবর্জনা মুক্ত করতে হয় [১, পৃষ্ঠা ১৪, ২৪]। এরপর ব্রাহ্মণদের ভোজন করিয়ে এবং নির্দিষ্ট আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ভূমি শোধন সম্পন্ন করা হয় [১, পৃষ্ঠা ১৫, ২৫]

পরিমাপের সুতা ও অমঙ্গলজনক সংকেত:

রঙ্গালয় পরিমাপের জন্য মুঞ্জা ঘাস, তুলা বা গাছের বাকল দিয়ে তৈরি বিশেষ সুতা বা ‘সূত্র’ ব্যবহার করার বিধান রয়েছে [১, পৃষ্ঠা ১৫, ২৫]। পরিমাপের সময় এই সূত্র ছিঁড়ে যাওয়া অত্যন্ত অমঙ্গলজনক মনে করা হয়। ভরত মুনির মতে, সুতা যদি দুই টুকরো হয় তবে মালিকের মৃত্যু হতে পারে, তিন টুকরো হলে রাষ্ট্রে বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে এবং চার টুকরো হলে নাট্যকার্যই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে [১, পৃষ্ঠা ১৫, ২৫]। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পবিত্র মনে এই পরিমাপ কাজ সম্পন্ন করতে হয়।

ভিত্তিপ্রস্তর ও স্তম্ভ স্থাপন:

জমি শোধনের পর শুভ নক্ষত্রে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে মৃদঙ্গ, পণব, দুন্দুভি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয় এবং ব্রাহ্মণ, রাজা ও শিল্পীদের বিভিন্ন উপাদেয় অন্ন (পায়েস, মধু মিশ্রিত অন্ন) ভোজন করানো হয় [১, পৃষ্ঠা ২৭]। এরপর রঙ্গালয়ে চারটি প্রধান স্তম্ভ বা পিলার স্থাপন করা হয়, যা বর্ণভেদে চারটি স্তম্ভ নামে পরিচিত—ব্রাহ্মণ স্তম্ভ (সাদা), ক্ষত্রিয় স্তম্ভ (লাল), বৈশ্য স্তম্ভ (হলুদ) এবং শূদ্র স্তম্ভ (নীল) [১, পৃষ্ঠা ১৬, ২৮]। স্তম্ভ স্থাপনের সময় নির্দিষ্ট দান-দক্ষিণা এবং পূজা করা হয় এবং লক্ষ্য রাখা হয় যেন স্তম্ভগুলো না কাঁপে বা না ঘোরে [১, পৃষ্ঠা ২৯]।

 

রঙ্গালয় মূলত কয়েকটি প্রধান অংশে বিভক্ত থাকে-

·      নেপথ্যগৃহ:

এটি অভিনেতাদের সাজঘর, যা রঙ্গালয়ের একেবারে পেছনে অবস্থিত এবং এতে রঙ্গমঞ্চে প্রবেশের জন্য দুটি দরজা থাকে।

·      রঙ্গশীর্ষ ও রঙ্গপীঠ:

রঙ্গপীঠ হলো অভিনয়ের প্রধান স্থল। রঙ্গশীর্ষের উপরিভাগ আয়নার মতো মসৃণ হওয়া উচিত এবং এটি বিভিন্ন মণি-মাণিক্য (হীরা, নীলা, সোনা) দিয়ে অলংকৃত করা হয় [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার, পৃষ্ঠা ১৭, ৩২]। রঙ্গশীর্ষে বাঘ, হাতি বা সাপের সুন্দর কাঠের মূর্তি খোদাই করার বিধানও রয়েছে [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার, পৃষ্ঠা ১৭, ৩২]।

·      মত্তবারণী:

রঙ্গমণ্ডপের দুই পাশে দেড় হাত উঁচুতে আটটি স্তম্ভ বিশিষ্ট বারান্দা সদৃশ অংশকে মত্তবারণী বলা হয় [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার, পৃষ্ঠা ১৬, ৩০]।

·      প্রেক্ষাগৃহ (আসন ব্যবস্থা):

দর্শকদের বসার স্থানটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে পিছনের সারি সামনের সারির চেয়ে ১ হাত উঁচুতে থাকে, যা বর্তমানের গ্যালারি বা স্টেডিয়াম আকৃতির আসনের অনুরূপ [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার, পৃষ্ঠা ১৮, ৩৪]।

·      শব্দবিজ্ঞান ও অলংকরণ:

ভরত মুনি রঙ্গালয়কে ‘পর্বত গুহাকৃতি’ এবং দ্বীতল (দোতলা) করার পরামর্শ দিয়েছেন যাতে বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত না হয়ে গম্ভীর ও সুমধুর শোনায় [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার, পৃষ্ঠা ১৭, ৩৩]। শব্দবিজ্ঞান বা Acoustics-এর এই প্রয়োগ প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যের উন্নত নিদর্শনের পরিচয় দেয়। এছাড়া রঙ্গালয়ের দেয়ালগুলো চুনকাম করে তাতে লতা-পাতা, নারী-পুরুষের প্রতিকৃতি এবং বিভিন্ন মনোরম চিত্রকর্ম দ্বারা সজ্জিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার, পৃষ্ঠা ১৭, ৩৪]

 



ভরত নাট্যশাস্ত্রের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বর্ণিত ত্রিমাত্রিক নাট্যমণ্ডপের মধ্যে ‘বিকৃষ্ট মধ্যম রঙ্গালয়’ (Rectangular Medium Playhouse) সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রায়োগিক দিক থেকে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত। আচার্য ভরত নিজেই একে মর্ত্যলোকের বা সাধারণ মানুষের অভিনয়ের জন্য শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।



বিকৃষ্ট মধ্যম রঙ্গালয়ের সামগ্রিক আয়তন, অনুপাত ও জ্যামিতিক বিন্যাস-

চিত্রের বহিরাবরণী পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই প্রেক্ষাগৃহটি একটি সম্পূর্ণ সুষম আয়তাকার (Rectangular) জ্যামিতিক নকশার ওপর প্রতিষ্ঠিত। ভরত নাট্যশাস্ত্রের পরিমাপ অনুযায়ী এর দৈহিক বিস্তৃতি অনুপাত ২:১

  • দৈর্ঘ্য (Length): সর্বমোট ৬৪ হাত
  • প্রস্থ (Width): সর্বমোট ৩২ হাত। এই সুনির্দিষ্ট অনুপাতটি অভিনেতাদের কণ্ঠস্বর যেন কোনো যান্ত্রিক পরিবর্ধক (Microphone) ছাড়াই হলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সমান তীব্রতায় পৌঁছাতে পারে (Acoustic Efficiency) এবং দর্শকরা যেন অভিনেতার চোখের সূক্ষ্ম ভাব প্রকাশও স্পষ্ট দেখতে পান, তা নিশ্চিত করার জন্য বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।

প্রধান ত্রি-বিভাগীয় গাঠনিক রূপরেখা (Structural Tri-Division)

চিত্রের অনুভূমিক বিন্যাস লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সমগ্র ক্ষেত্রটিকে প্রধান তিনটি সমান্তরাল অংশে বিভক্ত করা হয়েছে, যা নাট্যপ্রযোজনার কারিগরি ও নান্দনিক প্রয়োজনকে সিদ্ধ করে:

নেপথ্যগৃহ (The Greenroom / Backstage):

  • পরিমাপ: প্রেক্ষাগৃহের সর্বপশ্চিমে বা পেছনের অংশে এর অবস্থান। এর দৈর্ঘ্য ৩২ হাত এবং প্রস্থ ১৬ হাত
  • কার্যকারিতা: এটি অভিনেতাদের রূপসজ্জা, পোশাক পরিবর্তন এবং মঞ্চে প্রবেশের পূর্বপ্রস্তুতির স্থান। মূল মঞ্চের সঙ্গে এর সংযোগ স্থাপনের জন্য দুটি প্রধান প্রবেশদ্বার এবং মধ্যবর্তী যবনিকা (পর্দা) বা স্তম্ভ বিন্যাস চিত্রে দৃশ্যমান।

রঙ্গমঞ্চ (The Stage Area):

মধ্যবর্তী ১৬ হাত × ৩২ হাত অংশটি নাটকের মূল পরিবেশন ক্ষেত্র। এটি অত্যন্ত জটিল এবং সূক্ষ্ম স্থাপত্যশৈলীর স্বাক্ষর বহন করে। চিত্রে এটি কয়েকটি উপ-বিভাগে বিভক্ত-

  • রঙ্গশীর্ষ (Upstage): নেপথ্যগৃহের ঠিক সম্মুখে এবং রঙ্গপীঠের পেছনে অবস্থিত ৮ হাত × ৮ হাত পরিমাপের এই অংশটি মূলত আবহ সংগীতের যন্ত্রী বা কুতপ বিন্যাসের (Orchestra) জন্য ব্যবহৃত হতো।
  • অপেক্ষা স্থান (Wings / Ante-chamber): রঙ্গশীর্ষের দুই পার্শ্বে ১২ হাত বিশিষ্ট দুটি অপেক্ষাস্থান রয়েছে, যেখানে অভিনেতারা মঞ্চে প্রবেশের ঠিক পূর্বমুহূর্তে অবস্থান নেন।
  • রঙ্গপীঠ (Downstage / Main Performing Area): এটিই মূল অভিনয় মঞ্চ, যার পরিমাপ ১৬ হাত × ৮ হাত। দর্শকরা প্রধানত এই অংশের অভিনয়ের ওপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখেন।
  • মত্তবারণী (Side Balconies / Verandahs): রঙ্গপীঠের দুই পার্শ্বে ৮ হাত × ৮ হাত পরিমাপের দুটি বর্গাকার ক্ষেত্র। চিত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, মত্তবারণী দুটি মূল মেঝে থেকে ১.৫ হাত উচ্চতায় নির্মিত। এই স্থানটি বিশেষ কোরাস, দেব-দেবীর আবির্ভাব অথবা নাটকের উপ-কাহিনীর সমান্তরাল উপস্থাপনার জন্য অলিন্দ বা বারান্দা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নকশায় চার কোণায় অবস্থিত বৃত্তাকার চিহ্নগুলো একে ধারণকারী স্তম্ভের প্রতীক।

প্রেক্ষাগৃহ বা দর্শকাসন (The Auditorium / Auditorium Chamber):

মঞ্চের সামনের ৩২ হাত × ৩২ হাত আয়তনের সুবিশাল বর্গাকার অংশটি দর্শকদের বসার জন্য সংরক্ষিত। প্রাচীন নাট্যপ্রযোজনার সামাজিক বিন্যাস অনুযায়ী এটি নকশাবদ্ধ করা হয়েছে।

সামাজিক স্তরবিন্যাস ও আসন বিন্যাসের স্থাপত্যশৈলী (Socio-Spatial Seating Hierarchy)

বিকৃষ্ট মধ্যম রঙ্গালয় চিত্রে নাট্যশাস্ত্রের সমাজতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যগত ধারণার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়। কেন্দ্রে দর্শকদের বসার জন্য একটি সুশৃঙ্খল গ্যালারি নকশা করা হয়েছে, যেখানে ৪টি প্রধান ব্লকে বিভক্ত মোট ৯৬টি আসন সারি (প্রতি ব্লকে ২৪টি করে সারি) সুবিন্যস্ত রয়েছে।

সামাজিক মর্যাদা, শৃঙ্খলা এবং বর্ণভেদ প্রথার প্রাচীন নিয়ম মেনে দর্শকদের আসন ও স্তম্ভগুলো চার রঙের প্রতীকে নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে:

1.   ব্রাহ্মণ আসন: মঞ্চের একদম সম্মুখে, সবচেয়ে অগ্রবর্তী স্থানে শ্বেতশুভ্র স্তম্ভ দ্বারা চিহ্নিত আসন। এটি সর্বোচ্চ আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণীর প্রতীক।

2.   ক্ষত্রিয় আসন: মধ্যবর্তী স্থানে রক্তিম (লাল) স্তম্ভ দ্বারা সুশোভিত আসন। এটি রাজ্যপরিচালক ও বীর যোদ্ধাদের সংরক্ষিত স্থান।

3.   বৈশ্য আসন: প্রেক্ষাগৃহের উত্তর-পশ্চিম কোণে সবুজ স্তম্ভ দ্বারা নির্দেশিত আসন, যা ব্যবসায়ী ও উৎপাদক শ্রেণীর জন্য নির্ধারিত।

4.   শূদ্র আসন: প্রেক্ষাগৃহের উত্তর-পূর্ব কোণে নীল স্তম্ভ দ্বারা চিহ্নিত আসন, যা শ্রমজীবী শ্রেণীর জন্য নির্দিষ্ট।

 

প্রবেশপথ ও দূরত্বের বৈজ্ঞানিক উপযোগিতা (Circulation & Acoustics)

চিত্রটিতে প্রেক্ষাগৃহের বিভিন্ন অংশে "১২ ফুট দূর" নামক একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের পরিমাপ বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। এটি দর্শকদের বসার সারি থেকে দেওয়ালের দূরত্ব, প্রধান প্রবেশদ্বার থেকে আসনের দূরত্ব এবং মঞ্চের সম্মুখভাগ থেকে প্রথম দর্শকসারির মধ্যকার নিখুঁত ব্যবধান নির্দেশ করে। এই স্থাপত্য কৌশলটি দুটি প্রধান কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

  • নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত (Easy Circulation): নাটক চলাকালীন দর্শক বা নাট্যকর্মীদের চলাচলে যেন কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
  • ধ্বনিবিজ্ঞান (Acoustic Perfection): এই ১২ ফুটের দূরত্বের ব্যবধান দেওয়ালে প্রতিফলিত শব্দের প্রতিধ্বনি (Echo) রোধ করে এবং প্রেক্ষাগৃহের সর্বত্র একটি সমপ্রকৃতির ও মধুর নাদ বা শব্দতরঙ্গ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

 

আমার পুনর্নির্মিত এই চিত্রটি একাধারে প্রাচীন ভারতীয় নাট্য-স্থাপত্যের (Theatrical Architecture) এক কালজয়ী দলিল। এটি প্রমাণ করে যে, আজ থেকে হাজার বছর পূর্বেও ভারতীয় উপমহাদেশে নাট্যমঞ্চ নির্মাণ কেবল শিল্পকলার বহিঃপ্রকাশ ছিল না, বরং তা ছিল জ্যামিতি, শব্দবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের এক পরম উৎকর্ষের নিদর্শন। ভরত নাট্যশাস্ত্রের প্রেক্ষাগৃহ পরিকল্পনা কেবল একটি স্থাপত্য কাঠামো নয়, বরং এটি একটি সুসংহত শিল্প-দর্শন। পরিমাপের সূক্ষ্মতা, ভূমির বিশুদ্ধতা, স্তম্ভের পূজা থেকে শুরু করে শব্দবিজ্ঞানের নিখুঁত প্রয়োগ—সবকিছুই একটি সার্থক নাট্য পরিবেশনার অনুকূল পরিবেশ তৈরির জন্য করা হয়েছিল। ভরত মুনির এই কালজয়ী নির্দেশনা আজও বিশ্ব নাট্য স্থাপত্যের ইতিহাসে এক অনন্য স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত। [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার, পৃষ্ঠা ৩০, ৩৩]

 

 

তথ্যসূত্র:

*১ = [(মূল বই: ভরত নাট্যশাস্ত্র) তথ্যসূত্র: মুহাম্মদ আল ইমরানের একাডেমিক নোট, জ.বি.,না.বি., ২য় বর্ষ ১ম সেমিস্টার]

শিরোনাম:

ভরত নাট্যশাস্ত্রে রঙ্গালয়: চিত্র সহ বিকৃষ্ট মধ্যমের নির্মাণশৈলী।

লেখকের নাম: মুহাম্মদ আল ইমরান।

মোবাইল নম্বর: ০১৫৫১৭২৫৯১১

বর্তমান ঠিকানা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

 

 

 

Comments