নাট্যতত্ত্বের ইতিহাসে গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল-এর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়।
তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘পোয়েটিকস্’ বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যতাত্ত্বিক
গ্রন্থ, যেখানে তিনি মূলত ট্র্যাজেডির বিশদ আলোচনা করেছেন। তবে কমেডি সম্পর্কেও তিনি
কিছু মৌলিক ধারণা প্রদান করেন, যদিও তার কমেডি-সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ইতিহাসের
ধারায় হারিয়ে গেছে। তবুও তার বিচ্ছিন্ন মন্তব্য, সংজ্ঞা এবং পরবর্তী সাহিত্যসমালোচকদের
ব্যাখ্যা থেকে এরিস্টটলের কমেডি-তত্ত্বের একটি রূপরেখা তৈরি করা হলো:
প্রাচীন গ্রিক নাট্যতত্ত্ব এবং দার্শনিক বিশ্লেষণের আলোকে কমেডি হলো এমন এক ধরণের
নাটকীয় শিল্প যা মূলত মানুষের হাস্যকর দিকগুলো তুলে ধরে। এরিস্টটলের মতে, কমেডি হলো
'মানুষের চেয়েও নিম্নস্তরের' (worse than the average) চরিত্রের অনুকরণ। তবে এখানে
'নিম্নস্তরের' বলতে তাদের চরিত্রের কোনো চরম মন্দ দিক বোঝানো হয়নি, বরং তাদের সেই
'হাস্যকর' (ludicrous) ত্রুটিগুলোকে বোঝানো হয়েছে যা কোনো বিশেষ যন্ত্রণা বা বিনাশের
কারণ হয় না। কমেডির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের কুৎসিত বা অসংগতিপূর্ণ রূপকে এমনভাবে
উপস্থাপন করা যা দর্শকের মনে করুণা বা ভীতির বদলে নির্মল হাসির উদ্রেক করে।
কমেডির উৎপত্তি ও ইতিহাস গ্রিক কমেডির বিকাশ ট্র্যাজেডির বেশ পরে ঘটেছিল। এরিস্টটলের
মতে, ট্র্যাজেডির উৎপত্তি যেমন 'ডিথাইরাম্ব' (dithyramb) থেকে, কমেডির উৎপত্তি তেমনি
'ফ্যালিক গান' (phallic songs) থেকে। ৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে কমেডিকে আনুষ্ঠানিকভাবে
'সিটি ডায়োনিসিয়া' (City Dionysia) উৎসবের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং কোরাস প্রদান
করা হয়। 'কমেডি' শব্দটি সম্ভবত 'কোমাাই' (Komai - গ্রাম) বা 'কোমাজেইন' (Komazein
- আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠা) থেকে এসেছে। গ্রামের প্রান্তিক মানুষের আমোদ-প্রমোদ এবং ডায়োনিসাস
দেবতার সম্মানে আয়োজিত শোভাযাত্রাই ছিল এর আদি রূপ।
ব্যুৎপত্তি ও উৎপত্তি: 'কমেডি'
শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ 'কোমোস' (Komos) এবং 'ওডে' (Ode) থেকে, যার অর্থ যথাক্রমে
আনন্দ-শোভাযাত্রা এবং গান। এর আদি উৎস নিহিত ছিল প্রাচীন গ্রিসের উর্বরতার দেবতা ডায়োনিসাসের
উৎসবের 'ফ্যালিক গানে'।
হেনরি বার্গসঁ-র তত্ত্বে কমেডিকে দেখা হয়েছে সমাজের একটি 'সংশোধনমূলক' অস্ত্র
হিসেবে। তার মতে, কমেডি বা হাস্যরস মূলত মানুষের যান্ত্রিকতা (rigidity) বা অন্যমনস্কতার
বিরুদ্ধে সমাজের এক ধরণের প্রতিক্রিয়া। যখন কোনো মানুষ পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে
না পেরে যান্ত্রিক আচরণ করে, সমাজ তখন হাসির মাধ্যমে তাকে সতর্ক করে দেয়।
প্রাচীন গ্রিক নাট্যকলায় কমেডিকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়:
১. পুরানো কমেডি(Old Comedy): ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগের কমেডিগুলোকে বলা হয়
পুরানো কমেডি। এর প্রধান রূপকার ছিলেন এরিস্টোফেনিস (Aristophanes)।
বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যঙ্গ বা স্যাটায়ারের (satire) উপর
ভিত্তি করে তৈরি হতো। সমসাময়িক রাজনীতি, যুদ্ধ-বিগ্রহ (যেমন শান্তি বা যুদ্ধের প্রশ্ন)
এবং নাট্যকারের অপছন্দের ব্যক্তি বা প্রথা নিয়ে এতে কৌতুক করা হতো।
গঠন: এতে ২৪ জন সদস্যের একটি 'কোরাস' (chorus) থাকতো যারা গান ও নাচের মাধ্যমে
হাস্যরস তৈরি করত। রূপক কাহিনী, ফ্যান্টাসি এবং কাব্যের এক অদ্ভুত মিশ্রণ দেখা যেত
এখানে।
পোশাক: অভিনেতারা আঁটসাঁট পোশাক পরতেন এবং পুরুষ চরিত্রগুলোতে প্রায়শই 'ফ্যালাস'
(phallus) যুক্ত করা হতো যা স্থূল রসিকতার উৎস ছিল।
২. নতুন কমেডি (New Comedy): এটি খ্রিস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীর শেষভাগের ধারা,
যার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মেনান্দার (Menander)-এর নাম।
বৈশিষ্ট্য: এটি পুরানো কমেডির মতো আক্রমণাত্মক বা রাজনৈতিক ছিল না। এর বিষয়বস্তু
নেওয়া হতো তৎকালীন এথেন্সের মধ্যবিত্ত মানুষের প্রাত্যহিক জীবন থেকে।
পরিবর্তন: নতুন কমেডিতে কোরাসের গুরুত্ব অনেক কমে গিয়েছিল এবং নাটকটি কয়েকটি
দৃশ্যে ভাগ করার জন্য কেবল বিরতি হিসেবে কোরাস ব্যবহৃত হতো। পোশাক এবং মঞ্চসজ্জায় বাস্তবানুগতার
(realism) দিকে ঝোঁক ছিল বেশি।
কমেডির দর্শন ও এরিস্টটলের দৃষ্টিভঙ্গি এরিস্টটল তার 'পোয়েটিক্স' গ্রন্থে কমেডির
লক্ষণ নির্দেশ করতে গিয়ে একে 'নিম্নস্তরের চরিত্রের অনুকরণ' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এখানে 'কুৎসিত' বা 'হাস্যকর' বলতে সেই ধরণের অসংগতিকে বোঝানো হয়েছে যা দর্শকের মনে
কোনো বেদনাদায়ক অনুভূতি তৈরি করে না। কমেডি মূলত মানুষের চরিত্রের নেতিবাচক বা হাস্যকর
দিকগুলো সাধারণীকরণের (Generalization) মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলে। ট্র্যাজেডি যেখানে অনন্য
ব্যক্তিদের কাহিনী শোনায়, কমেডি সেখানে মানুষের চারিত্রিক ধরণ বা 'টাইপ' (type) তৈরি
করে। যেমন—'কৃপণ', 'অন্যমনস্ক' বা 'দাম্ভিক'—এগুলো কোনো বিশেষ ব্যক্তি নয় বরং এক একটি
চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।
এরিস্টটলের পোয়েটিকস্ অনুযায়ী ট্র্যাজেডি ও কমেডির প্রধান বৈসাদৃশ্যগুলো নিচের
সারণিতে স্পষ্ট করা হলো:
|
বিষয় |
ট্র্যাজেডি |
কমেডি |
|
চরিত্রের ধরণ |
অভিজাত ও সংবেদনশীল নায়ক। |
সাধারণ বা নিম্নস্তরের লঘু ত্রুটিযুক্ত
চরিত্র। |
|
ঘটনার প্রকৃতি |
গুরুগম্ভীর, মহিমান্বিত এবং ধ্বংসাত্মক। |
লঘু, কৌতুকপূর্ণ এবং জীবনের অসংগতিপূর্ণ। |
|
পরিণতি ও প্রভাব |
ক্যাথারসিস বা করুণা ও ভীতির উদ্রেক। |
সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা ও নির্মল আনন্দ দান। |
হেনরি বার্গসঁ কমেডিকে জীবনের এক যান্ত্রিক প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার
বিখ্যাত তত্ত্ব হলো—'যান্ত্রিকতা যখন জীবনের ওপর চেপে বসে' (The mechanical
encrusted upon the living), তখনই হাস্যরস তৈরি হয়। একটি সজীব মানুষের চালচলন যদি যন্ত্রের
মতো আড়ষ্ট বা পুনরাবৃত্তিমূলক হয়ে পড়ে, তবে তা আমাদের কাছে হাস্যকর মনে হয়। বার্গসঁ
হাসিকে একটি সামাজিক 'ইঙ্গিত' হিসেবে দেখেন, যা ব্যক্তিকে তার গোঁয়ার্তুমি বা অসামাজিক
অনমনীয়তা থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করে।
জ্যাক-ইন-দ্য-বক্স (Jack-in-the-box): একটি বল বা শক্তিকে বারবার চেপে রাখা হয়
এবং সে বারবার লাফিয়ে বের হয়। নাটকে যখন কোনো চরিত্রকে বারবার বাধা দেওয়া সত্ত্বেও
সে একই কাজ করতে থাকে, তখন তা কমেডি হয়ে ওঠে।
তুষার-গোলক (Snow-ball): ছোট একটি ঘটনা থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে বড় বিপর্যয়ের
দিকে যাওয়া কমেডির এক অন্যতম কৌশল।
পুনরাবৃত্তি ও বৈপরীত্য (Repetition and Inversion): একই দৃশ্য বা সংলাপের বারবার
ফিরে আসা অথবা প্রভু-ভৃত্যের ভূমিকার অদলবদল (যেমন ভৃত্য যখন প্রভুকে শাসন করে) দর্শককে
আনন্দ দেয়।
কমেডি বনাম ট্র্যাজেডি কমেডি এবং ট্র্যাজেডির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো তাদের
বিষয়বস্তু এবং দর্শকের অনুভূতির ওপর প্রভাব। ট্র্যাজেডি গম্ভীর এবং মহৎ চরিত্রের কাহিনী,
যা ভয় এবং করুণার (pity and fear) উদ্রেক করে 'ক্যাথারসিস' (catharsis) ঘটায়। অন্যদিকে
কমেডি হালকা মেজাজের এবং এটি বুদ্ধিদীপ্ত আনন্দের ওপর নির্ভরশীল। কমেডির জন্য এক ধরণের
'মানসিক অসাড়তা' (momentary anesthesia of the heart) প্রয়োজন, অর্থাৎ দর্শকের মনে
আবেগের চেয়ে বুদ্ধির প্রাধান্য থাকতে হবে। যদি আমরা চরিত্রের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল
হয়ে পড়ি, তবে আমরা তার বিপর্যয়ে হাসতে পারব না।
প্রাচীন গ্রিস থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত কমেডি নাটক শিল্পকলায় তার গুরুত্ব
বজায় রেখেছে। এটি কেবল হাসানোর মাধ্যম নয়, বরং মানুষের ভুলভ্রান্তি এবং সামাজিক জড়তাকে
চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার এক শৈল্পিক কৌশল। এরিস্টটলের তাত্ত্বিক ভিত্তি এবং বার্গসঁ-র
মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, কমেডি আসলে মানুষের অপূর্ণতাকেই
উৎসবের আকারে উদযাপন করার এক মাধ্যম।
পরিশেষে বলা যায়, কমেডি হলো জীবনের এক ইতিবাচক ও মিলনাত্মক শিল্পরূপ। মানুষের
ক্ষুদ্রতা, মূর্খতা ও ভুলত্রুটিকে পরম মমতায় হাস্যরসের মাধ্যমে এটি এক গভীর সত্যে
রূপান্তরিত করে। এটি জীবনের নেতিবাচক দিকগুলোকে লঘু করে দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত এক শান্তিময়
ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। আর এভাবেই কমেডি আমাদের জীবনের দুঃখ-গ্লানিকে
জয় করার এক অনাবিল শক্তি জোগায়।
..........................................
প্রধান গ্রন্থপঞ্জি:
১. নাট্যতত্ত্ব বিচার – ডাঃ দুর্গাশঙ্কর
মুখোপাধ্যায়
২. Laughter: An Essay on the
Meaning of the Comic – Henri Bergson
৩. এরিস্টটলের পোয়েটিক্স ও সাহিত্যতত্ত্ব
– ডঃ সাধনকুমার ভট্টাচার্য
৪. কাব্যতত্ত্ব, আরিস্টটল – শিশিরকুমার
দাশ
৫. আফরিন হুদা ম্যামের লেকচার।
কৃতজ্ঞতা: আফরিন হুদা
প্রভাষক, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
শিরোনাম: এরিস্টটলের নাট্যদর্শন: কমেডির তত্ত্ব, ইতিহাস ও রূপরেখা।
লেখক: মুহাম্মদ আল ইমরান
শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Comments
Post a Comment