ফ্রেইট্যাগ-এর পিরামিড (Freytag's Pyramid) অনুসারে সফোক্লিসের 'রাজা ইডিপাস' নাটকের বিশ্লেষণ:
১. উন্মোচন (Exposition): এটি নাটকের একেবারে শুরুর অংশ। এখানে পাঠক বা দর্শকের
সামনে গল্পের পটভূমি, মূল চরিত্রসমূহ এবং তাদের চারপাশের পরিবেশ বা প্রেক্ষাপট উন্মোচন
করা হয়। কোনো মূল দ্বন্দ্ব শুরু হওয়ার আগে পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা এখানে দেখানো হয়।
উদাহরণ: ইডিপাস নাটকের
শুরুতে দেখা যায় থিবস নগরীতে এক ভয়াবহ মহামারী দেখা দিয়েছে। প্রজারা তাদের প্রিয়
রাজা ইডিপাসের কাছে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের প্রার্থনা জানায়। ইডিপাস ইতিপূর্বেই
ক্রেয়নকে ডেলফির মন্দিরে পাঠিয়েছেন এর প্রতিকার জানতে।
২. উদ্দীপকারী ঘটনা (Inciting Incident): গল্পের মূল মোড় ঘোরানোর পেছনে যে নির্দিষ্ট
ঘটনাটি কাজ করে, তাকেই 'ইন্সাইটিং ইন্সিডেন্ট' বা উদ্দীপকারী ঘটনা বলে। এটি শান্ত ও
স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একটি ধাক্কা দেয় এবং মূল চরিত্রকে একটি নতুন যাত্রা বা সংকটের
দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনাটি ছাড়া গল্পের মূল দ্বন্দ্ব বা অ্যাকশন শুরু হতো না।
উদাহরণ: ক্রেয়ন ডেলফি
থেকে ফিরে এসে জানান যে, থিবসের প্রাক্তন রাজা লায়াসের হত্যাকারী এই নগরীতেই
লুকিয়ে আছে। সেই হত্যাকারীকে খুঁজে বের করে শাস্তি দিলেই মহামারী থেকে মুক্তি
পাওয়া সম্ভব। এই ঘোষণাটিই নাটকের মূল কাহিনিকে গতিশীল করে তোলে।
৩. ঊর্ধ্বমুখি ক্রিয়া (Rising Action):
উদ্দীপকারী ঘটনার পর থেকে গল্পের জটিলতা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। মূল চরিত্রটি তার লক্ষ্য
অর্জন করতে গিয়ে বিভিন্ন বাধা, চক্রান্ত বা ভেতরের ও বাইরের দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হয়।
এই ধাপে উত্তেজনা এবং কৌতুহল ক্রমশ পিরামিডের চূড়ার দিকে (ঊর্ধ্বমুখী) ধাবিত হয়।
উদাহরণ: ইডিপাস লায়াসের
হত্যাকারীকে খুঁজে বের করার শপথ নেন। তিনি অন্ধ দৈবজ্ঞ টাইরেসিয়াসকে তলব করেন,
যিনি ইডিপাসকেই হত্যাকারী হিসেবে ইঙ্গিত দেন। এতে ইডিপাস ক্ষুব্ধ হন এবং ক্রেয়নের
বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনেন। জোকাস্টা ইডিপাসকে শান্ত করার জন্য লায়াসের
মৃত্যুর ঘটনা বর্ণনা করেন, যা শুনে ইডিপাসের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে যে হয়তো
তিনিই সেই হত্যাকারী।
৪. চূড়ান্ত জটিল অবস্থা (Climax):
এটি পিরামিডের একেবারে সর্বোচ্চ চূড়া বা গল্পের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অংশ। এখানে এসে
মূল দ্বন্দ্বটি চরম রূপ নেয় এবং কাহিনীর একটি বড় পরিবর্তন বা টার্নিং পয়েন্ট ঘটে। এই
মুহূর্তে এসে চরিত্রের ভাগ্য কোন দিকে যাবে (জয় নাকি পরাজয়, মিলন নাকি ট্র্যাজেডি)
তা নির্ধারিত হয়ে যায়।
উদাহরণ: করিন্থ থেকে
আসা এক বার্তাবাহক এবং থিবসের এক বৃদ্ধ মেষপালকের সাক্ষ্যের মাধ্যমে চূড়ান্ত সত্য
উন্মোচিত হয়। ইডিপাস বুঝতে পারেন যে বহু বছর আগে ডেলফির সেই ভয়াবহ দৈববাণী সত্যি
হয়েছে—তিনি অজান্তেই আপন পিতাকে হত্যা করেছেন এবং নিজের গর্ভধারিণী মাকে বিবাহ
করেছেন। এটিই নাটকের সর্বোচ্চ উত্তেজনার মুহূর্ত।
৫. নিম্নমুখী ক্রিয়া (Falling Action):
ক্লাইম্যাক্সের পর গল্পের উত্তেজনা বা টানটান ভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। চরম সংকটের
পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে, চরিত্রের নেওয়া সিদ্ধান্তের ফলাফল কী দাঁড়াচ্ছে
এবং জটগুলো কীভাবে খুলছে—তা এই নিম্নমুখী ক্রিয়ার মাধ্যমে দেখানো হয়।
উদাহরণ: সত্য জানার পর
জোকাস্টা লজ্জায় ও দুঃখে আত্মহত্যা করেন। ইডিপাস তার স্ত্রীর মৃতদেহ দেখে সহ্য
করতে পারেন না এবং জোকাস্টার পোশাকের সোনার কাঁটা দিয়ে নিজের চোখ দুটি অন্ধ করে
ফেলেন। তিনি তার এই পাপের জন্য নিজেকে চরম দণ্ড দেন।
৬. সমাধান (Resolution): এটি পিরামিডের
শেষ বিন্দু, যেখানে গল্পের সমস্ত দ্বন্দ্ব, রহস্য বা সমস্যার একটি চূড়ান্ত সমাধান ঘটে।
চরিত্রের জীবনে একটি নতুন স্বাভাবিকতা বা সমাপ্তি নেমে আসে। ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে এখানে
নায়কের পতন বা ধ্বংসের মাধ্যমে শেষ হয়, আর মিলনাত্মক গল্পের ক্ষেত্রে শুভ পরিণতির মাধ্যমে
সব শান্ত হয়।
উদাহরণ: নাটকের শেষে
ইডিপাস তার সন্তানদের দায়িত্ব ক্রেয়নের হাতে তুলে দেন এবং নিজের কৃতকর্মের
প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে থিবস থেকে নির্বাসিত হওয়ার প্রার্থনা করেন। থিবস নগরী
অভিশাপমুক্ত হয় এবং এক করুণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নাটকের সমাপ্তি ঘটে।
তথ্যসূত্র:
১. নাটক: সফোক্লিসের ইডিপাস।
২. তত্ত্ব: জার্মান ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার গুস্তাভ ফ্রেইটাগ তার
"ডাই টেকনিক দেস ড্রামাস" (Die Technik des Dramas) নামক গ্রন্থে (১৮৬৩
সালে প্রকাশিত) এই পাঁচ বা ছয়টি অংশের সমন্বয়ে গঠিত নাটকের কাঠামোটি ব্যাখ্যা
করেন। এটি ফ্রেইটাগের পিরামিড (Freytag's Pyramid) নামে পরিচিত।
লেখা: মুহাম্মদ আল ইমরান
শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Comments
Post a Comment