এরিস্টটল তার 'পোয়েটিকস' (Poetics) গ্রন্থে ট্র্যাজেডির আখ্যানভাগ এর গঠনশৈলী ও পরিমাণগত দিক থেকে প্রধানত পাঁচটি অংশে বিভক্ত করেছেন। নিচে এরিস্টটলের সেই শ্রেণিবিভাগ আলোচনা পূর্বক ইস্কিলাসের 'আগামেমনন' নাটকের গঠনশৈলীতে এই ভাগগুলো বিশ্লেষণ করা হলো:
১. প্রোলোগ
(Prologue): এটি নাটকের সেই প্রারম্ভিক অংশ যা কোরাসের প্রবেশের আগে উপস্থাপিত
হয়। এর মাধ্যমে নাটকের মূল কাহিনীর প্রেক্ষাপট দর্শকদের কাছে তুলে ধরা হয়। এই
প্রারম্ভিক পর্যায়ের শুরু বা 'আরম্ভ' এবং কাহিনীর 'বীজ' একত্রে 'মুখসন্ধি'
তৈরি করে।
'আগামেমনন' নাটকে
প্রাসাদের ছাদে পাহারাদারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা এবং ট্রয় জয়ের সংকেত হিসেবে
আলোক-শিখা দেখতে পাওয়ার দৃশ্যটি প্রোলোগের অন্তর্ভুক্ত। এর মাধ্যমে দর্শক জানতে
পারে যে দশ বছরের যুদ্ধের অবসান ঘটেছে এবং রাজা ফিরে আসছেন।
২. প্যারোডা (Parode):
প্রোলোগের পর কোরাস যখন প্রথম গান গাইতে গাইতে মঞ্চে প্রবেশ করে, তাকে প্যারোডাস
বলা হয়। এটি মূলত কোরাসের প্রথম সম্মিলিত সঙ্গীত যা নাটকের আবহ তৈরি করে।
পাহারাদের প্রস্থানের
পর কোরাস(আর্গসের বৃদ্ধরা) যখন প্রথম গান গাইতে গাইতে মঞ্চে প্রবেশ করে,
তাকে প্যারোডাস বলে। এই গানে কোরাস ট্রয় যুদ্ধের সূচনা, মেনেলাস ও আগামেমননের
অভিযান এবং যুদ্ধযাত্রার প্রাক্কালে দেবী আর্টেমিসকে তুষ্ট করতে আগামেমনন কর্তৃক
নিজ কন্যা ইফিজেনিয়াকে বলি দেওয়ার করুণ কাহিনী বর্ণনা করে। এটি নাটকের
ট্র্যাজিক আবহ তৈরি করে।
৩. এপিসোড
(Episode): কোরাসের দুটি পূর্ণাঙ্গ গানের মধ্যবর্তী সংলাপ-প্রধান অংশগুলোকে
এপিসোড বলা হয়। আধুনিক নাটকের 'অঙ্ক' বা 'দৃশ্যের' সাথে এর তুলনা করা যেতে পারে।
এখানেই পাত্র-পাত্রীর কথোপকথনের মাধ্যমে কাহিনী গতি লাভ করে। বলা যায়, এরিস্টটল এই
পর্যায়ে 'ঘটনা-ঐক্য' (Unity of Action) রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
এখানে পাত্র-পাত্রীদের
ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে কাহিনী গতিশীল হয়।
- প্রথম
এপিসোড: রানী ক্লাইটেমনেস্ট্রা কোরাসকে
আগুনের সংকেতের মাধ্যমে ট্রয় জয়ের সংবাদ নিশ্চিত করেন।
- দ্বিতীয়
এপিসোড: একজন বার্তা বাহক এসে যুদ্ধের
ভয়াবহতা এবং গ্রিকদের জয়ের বিস্তারিত বিবরণ দেন।
- তৃতীয় ও
প্রধান এপিসোড: রাজা আগামেমনন যুদ্ধজয়ী বীর
হিসেবে রথে চড়ে প্রাসাদে ফেরেন, সাথে থাকে বন্দিনী রাজকুমারী ক্যাসান্দ্রা।
রানী রাজাকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজপথের ওপর রক্তিম গালিচা বিছিয়ে দেন,
যা রাজার অতিদম্ভ উসকে দেয়, যদিও রাজা নিজ ইচ্ছায় গালিচায় যেতে চাননি। ক্যাসান্দ্রার
ভবিষ্যৎবাণী এবং তার মাধ্যমে পূর্বের রক্তপাতের স্মৃতিচারণও এখানে
গুরুত্বপূর্ণ।
৪. স্ট্যাসিমন
(Stasimon): এপিসোডগুলোর মধ্যবর্তী বিরতিতে কোরাস যখন নির্দিষ্ট ছন্দে মঞ্চে
স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গান গায়, তাকে স্টাসিমন বলে। এই গানের মাধ্যমে কাহিনীর মূল সুর
বা কোনো নৈতিক দর্শন ফুটে ওঠে।
গানগুলোতে যুদ্ধের
অভিশাপ, হেলেনের কারণে হওয়া রক্তপাত এবং মানুষের ওপর নিয়তির অমোঘ প্রভাবের প্রতিফলন
ঘটে। যেমন—আগামেমননের ফিরে আসার পর কোরাসের মনে যে গভীর আশঙ্কার সৃষ্টি হয়, তা
তাদের একটি স্টাসিমনে ফুটে ওঠে।
৫. একসোডাস
(Exodus): এটি নাটকের চূড়ান্ত বা সমাপ্তি অংশ। কোরাসের শেষ গানের পর থেকে
নাটকের শেষ পর্যন্ত পুরো ঘটনাপ্রবাহ এর অন্তর্ভুক্ত। এই অংশেই ট্র্যাজেডির চূড়ান্ত
বিপর্যয় বা লক্ষ্য অর্জিত হয়।
'আগামেমনন' নাটকে
প্রাসাদের ভেতর থেকে রাজার আর্তনাদ শোনা যাওয়ার পর থেকেই একসোডাস বা চূড়ান্ত
বিপর্যয়ের শুরু। ক্লাইটেমনেস্ট্রা রক্তাক্ত অস্ত্র হাতে আগামেমনন ও কাসান্দ্রার
মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে তার কাজের যৌক্তিকতা দাবি করেন। সবশেষে ঈজিস্থাসের আগমন এবং
কোরাসের সাথে তাদের বাক-বিতণ্ডার মধ্য দিয়ে নাটকটি শেষ হয়।
এরিস্টটলের মতে, একটি
সার্থক ট্র্যাজেডির আখ্যান কাঠামোর মধ্যে 'পেরিপেতিয়া' (Peripeteia) বা
ভাগ্যের আকস্মিক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি, যা কাহিনীকে নাটকীয়তা দান করে। এই
আখ্যানভাগের মধ্যেই ভাগ্যের আকস্মিক পরিবর্তন ঘটে, যা আগামেমননের ক্ষেত্রে তার
বিজয়ী বীর থেকে নিহত ব্যক্তিতে পরিণত হওয়ার মাধ্যমে সার্থকতা পেয়েছে।
শিরোনাম: এরিস্টটলের ট্র্যাজেডির
আখ্যানভাগের আলোকে ইস্কিলাসের 'আগামেমনন' নাটকের আখ্যানগঠন বিশ্লেষণ।
লেখা: মুহাম্মদ আল ইমরান (Muhammad Al Emran)
শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ
বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
