গ্রীক সংস্কৃতির অনুকরণে
রোমান নাট্যচর্চার সূত্রপাত ঘটলেও, রোমানরা খুব দ্রুতই তাদের নিজস্ব লৌকিক ঐতিহ্য,
এত্রুস্কান নৃত্যগীত এবং 'আতেল্লান প্রহসন'-এর মিশ্রণে এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী নাট্যশৈলী
গড়ে তোলে। রোমানদের কাছে নাটক কেবল কোনো ধর্মীয় বা দার্শনিক আচার ছিল না, বরং তা ছিল
নাগরিক বিনোদন ও উৎসবের এক ধর্মনিরপেক্ষ মাধ্যম। গ্রীক ট্র্যাজেডি ও কমেডির কাঠামোকে
গ্রহণ করে প্লাউতুস, তেরেন্স কিংবা সেনেকার মতো নাট্যকাররা যেভাবে রোমান থিয়েটারকে
এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা পরবর্তীকালে সমগ্র ইউরোপীয় নাট্যমঞ্চের আধুনিকায়নে ভিত্তিপ্রস্তর
হিসেবে কাজ করেছিল। ড. গীতা সেনগুপ্তের 'বিশ্বরঙ্গালয় ও নাটক' গ্রন্থ অবলম্বনে
রোমান থিয়েটারের ইতিহাস, উদ্ভব ও বিকাশের আলোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রোমান থিয়েটারের আদি
উৎস ও উদ্ভব
রোমান নাটকের মূলে ছিল
গ্রীক সভ্যতার গভীর প্রভাব। ঐতিহাসিক সত্য হলো, রোমানরা সামরিক শক্তিতে গ্রীস জয়
করলেও সাংস্কৃতিক দিক থেকে গ্রীকদের উন্নত সভ্যতার কাছে নতি স্বীকার করেছিল। তবে
গ্রীক প্রভাব আসার আগে রোমে কিছু আদিম লোকজ নাট্যরীতির অস্তিত্ব ছিল:
- ভেস্যুস্
ফেসেনিন্নি (Fescennine Verses): এটি ছিল
রোমের নিজস্ব আদিপ্রথা, যা মূলত গ্রাম্য ছড়া বা পদ্যের আকারে পরিবেশিত হতো।
- হাস্যকৌতুক
ও ব্যঙ্গ: শস্যদেবতা 'সিলভানুস' ও
'তেল্লুসের' সম্মানে আয়োজিত উৎসবে হাস্যকৌতুক ও ব্যক্তিগত ব্যঙ্গ সম্বলিত
অভিনয়ের চল ছিল।
- এত্রুস্কান
প্রভাব: ৩৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে
এত্রুরিয়া থেকে আসা সংগীত ও নৃত্যশিল্পীদের মাধ্যমে রোমে এক ধরণের ছন্দবদ্ধ
মূকাভিনয় বা 'এত্রুস্কান মাইমেটিক' নৃত্যের সূচনা হয়। এই নৃত্যের সাথে
রোমানদের 'ফেসেনিন্নি ভার্স' যুক্ত হয়ে 'সাতুরা' বা 'ফ্যাবুলায়ে
সাতুরায়ে' নামক এক মিশ্র নাট্যরীতির জন্ম দেয়, যা দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনা
নিয়ে রচিত হতো।
২. গ্রীক প্রভাব ও
নাট্যসাহিত্যের বিকাশ
খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়
শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রোমান নাট্যতত্ত্বের মোড় ঘুরে যায়।
- লিভিয়ুস্
আন্দ্রোনিকুস্: তিনি ছিলেন রোমের প্রথম
নাট্যকার। ২৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি রোমান উৎসবে (Ludi Romani) গ্রীক
ট্র্যাজেডি ও কমেডির প্রথম সার্থক অনুবাদ ও প্রবর্তন করেন।
- প্লাউতুস
(Plautus): রোমান কমেডির শ্রেষ্ঠ শিল্পী।
তিনি গ্রীক 'নিউ কমেডি'র আদর্শে ২১টি নাটক রচনা করেন। তার নাটকে নাগরিক
জীবনের প্রতিফলন থাকতো এবং তিনি 'কমিক আইরনি' ব্যবহারের মাধ্যমে
দর্শকদের আগে থেকেই নাটকের গোপন তথ্য জানিয়ে দিয়ে এক ধরণের উচ্চহাস্যরসের
সৃষ্টি করতেন।
- তেরেন্স
(Terence): তিনি মূলত শিক্ষিত ও অভিজাত
শ্রেণীর জন্য মার্জিত ভাষায় নাটক লিখতেন। তার রচনায় পাণ্ডিত্য থাকলেও
প্লাউতুসের মতো অবারিত জনপ্রিয়তা ছিল না।
- সেনেকা
(Seneca): রোমান ট্র্যাজেডির ক্ষেত্রে
সেনেকা ছিলেন অবিস্মরণীয়। তার নাটকগুলোতে রক্তপাত, ভয়াবহতা এবং প্রতিশোধের
প্রাধান্য ছিল, যাকে 'হরর ট্র্যাজেডি' বলা হয়। তার রচনাশৈলী
পরবর্তীকালে শেক্সপীয়রের মতো রেনেসাঁ যুগের নাট্যকারদের গভীরভাবে প্রভাবিত
করেছিল।
৩. রঙ্গালয় ও
স্থাপত্যের বৈপ্লবিক পরিবর্তন
রোমানরা
স্থাপত্যবিদ্যায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিল এবং গ্রীক থিয়েটারের কাঠামোর আমূল পরিবর্তন
ঘটিয়েছিল।
- অস্থায়ী
থেকে স্থায়ী মঞ্চ: শুরুতে রোমানরা
মন্দিরের সামনে কাঠের তৈরি অস্থায়ী মঞ্চে অভিনয় করত, যার নাম ছিল 'পুল্পিতাম্'।
- পম্পেই
থিয়েটার: খ্রিস্টপূর্ব ৫৫-৫২ অব্দে মহান
পম্পেই রোমে প্রথম স্থায়ী পাথর নির্মিত রঙ্গালয় তৈরি করেন। এটি ছিল এক বিশাল
স্থাপত্য, যেখানে প্রেক্ষাগারটি ছিল অর্ধবৃত্তাকার।
- স্থাপত্যিক
বৈশিষ্ট্য: গ্রীকরা পাহাড়ের ঢালে থিয়েটার
বানাত, কিন্তু রোমানরা সমতলভূমিতে বদ্ধ স্থাপত্য তৈরি করত। তাদের মঞ্চের
পশ্চাৎ-দেয়াল বা 'স্কেনে ফ্রন্স্' ছিল তিনতলা বিশিষ্ট এবং অত্যন্ত
জাঁকজমকপূর্ণ। এছাড়া রোমান থিয়েটারের প্রেক্ষাগারটি অনেক সময় চট বা ক্যানভাসের
আবরণ দিয়ে ঢাকা থাকত।
- অর্কেস্ট্রার
পরিবর্তন: গ্রীক নাটকে অর্কেস্ট্রা ছিল
কোরাসের জন্য, কিন্তু রোমান নাটকে কোরাসের গুরুত্ব কমে যাওয়ায় অর্কেস্ট্রার
স্থানটি অর্ধবৃত্তাকার হয়ে যায় এবং সেখানে অভিজাত দর্শকদের বসার ব্যবস্থা করা
হয়।
৪. সামাজিক প্রেক্ষাপট
ও নাটকের পরিণতি
রোমান সমাজে থিয়েটার
কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল জাঁকজমক ও বিলাসের প্রতীক।
- সেনেটের
বিরোধিতা: শুরুতে রোমান সেনেট বসে নাটক
দেখার বিরোধী ছিল, কারণ তারা এটিকে গ্রীকদের 'মেয়েলি বিলাস' মনে করত। ফলে এক
সময় দর্শকরা দাঁড়িয়ে নাটক দেখত। পরবর্তীতে এই নিয়ম বদলে যায় এবং দর্শকদের আসন
ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটে।
- অন্যান্য
বিনোদন: সময়ের সাথে সাথে রোমান দর্শকদের
রুচি বদলে যায়। গম্ভীর ট্র্যাজেডির চেয়ে তারা সার্কাস, রথ চালানো প্রতিযোগিতা
এবং গ্লাডিয়েটরদের প্রাণঘাতী যুদ্ধ দেখতে বেশি পছন্দ করত।
- মাইন ও
প্যান্টোমাইম: রিপাবলিকের শেষের দিকে 'মাইন'
(Mime) বা স্থূল কৌতুক এবং 'প্যান্টোমাইম' (Pantomime) বা অঙ্গভঙ্গি নির্ভর অভিনয়
অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
৫. গ্রীক ও রোমান
থিয়েটারের মূল পার্থক্য
- গ্রীকদের
কাছে নাটক ছিল একটি জাতীয় ধর্মীয় উৎসব ও পবিত্র বিষয়, কিন্তু রোমানদের কাছে
তা ছিল কেবল ঐশ্বর্য ও বিলাসের অঙ্গ।
- গ্রীক
নাটকে কোরাস ছিল প্রধান চালিকাশক্তি, যেখানে রোমান নাটকে কোরাস প্রায় বিলুপ্ত
হয়ে সংলাপ ও অভিনেতা-প্রধান হয়ে ওঠে।
- স্থাপত্যের
দিক থেকে রোমান থিয়েটার ছিল অনেক বেশি অলঙ্কৃত, জাঁকজমকপূর্ণ এবং নাগরিক
জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত।
পরিশেষে বলা যায়, রোমান
থিয়েটার গ্রীক নাট্যধারাকে ধারণ করেও স্থাপত্যে ও বিষয়বস্তুতে নিজস্ব রুচি ও
সংস্কৃতির প্রয়োগ ঘটিয়ে বিশ্ব নাট্য ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী স্বাক্ষর রেখে গেছে।
শিরোনাম: রোমান থিয়েটার: ইতিহাস, উদ্ভব ও বিকাশ।
লেখা: মুহাম্মদ আল ইমরান (Muhammad Al Emran)
শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ
বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
