অ্যারিস্টোফেনিসের 'শান্তি': যুদ্ধ-বিরোধী মনোভাবের এক অনন্য দলিল - মুহাম্মদ আল ইমরান

 

Ancient Drama's performance of Aristophanes' "Peace"

প্রাচীন গ্রিক নাট্যকার এরিস্টফেনিস ছিলেন যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে এক সোচ্চার কণ্ঠস্বর। তার জীবনকাল ছিল এথেন্সের স্বর্ণযুগ এবং পেলোপনেশীয় যুদ্ধের (৪৩১–৪০৪ খ্রি.পূ.) এক সন্ধিক্ষণে।

 

পেলোপনেশীয় যুদ্ধের (৪৩১–৪০৪ খ্রি.পূ.)

  • যুদ্ধের ব্যাপ্তি: ৪৩১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে স্পার্টা এথেন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের শুরু হয়, যা ৪০৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত চলে। ২৭ বছর চলে।
  • অ্যারিস্টোফেনিসের ওপর প্রভাব: অ্যারিস্টোফেনিস তাঁর যৌবনের শুরুতেই এই যুদ্ধের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তার অধিকাংশ নাটকই এই যুদ্ধের সমসাময়িক সময়ে রচিত এবং সেগুলোতে যুদ্ধের মর্মান্তিক দৃশ্যাবলি ফুটে উঠেছে।
  • সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয়: এই যুদ্ধের কারণে এথেন্সের দীর্ঘদিনের সুখ-সমৃদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়। যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মহামারীতে এথেন্সের সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মহান শাসক পেরিক্লিসও মৃত্যুবরণ করেন।
  • শান্তির প্রচেষ্টা: যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে শান্তির সুযোগ আসলেও তৎকালীন উদ্ধত রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে তা সম্ভব হয়নি।

অ্যারিস্টোফেনিস তার 'শান্তি' নাটকটি ৪২১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মঞ্চস্থ করেন, যা সরাসরি এই যুদ্ধ-বিরোধী মনোভাব থেকেই রচিত হয়েছিল। যুদ্ধের কারণে এথেন্সের যে অবর্ণনীয় দুর্দশা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা তার সাহিত্যকর্মে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তার 'শান্তি' (The Peace) নাটকটি গ্রিক জাতির যুদ্ধ প্রবণতার বিরুদ্ধে তার একটি শক্তিশালী শৈল্পিক প্রতিবাদ। 'শান্তি' নাটকের আলোকে এরিস্টফেনিসের যুদ্ধ-বিরোধী মনোভাবের বিশ্লেষণ করা হলো:

যুদ্ধের ভয়াবহতা ও দেবতাদের অসন্তোষ: নাটকের পটভূমিতে দেখা যায়, গ্রিকদের ক্রমাগত বিবাদ-বিসংবাদ ও যুদ্ধ-বিগ্রহে দেবরাজ জিউসসহ অন্যান্য দেবতারা চরম বিরক্ত হয়ে মর্ত্যবাসীদের যুদ্ধের দেবতা ও তার ভৃত্য 'গোলমাল'-এর হাতে ছেড়ে দিয়ে দূরে চলে গেছেন। শান্তির দেবীকে একটি গভীর গর্তে বন্দি করে রাখা হয়েছে এবং যুদ্ধের দেবতা গ্রিক নগরগুলোকে একটি বিশাল হামানদিস্তায় পিষে ফেলার পরিকল্পনা করছেন। এই রূপকের মাধ্যমে এরিস্টফেনিস যুদ্ধের ধ্বংসলীলাকে ফুটিয়ে তুলেছেন।

সাধারণ মানুষের আকুতি ও ট্রাইগেয়ুসের যাত্রা: নাটকের নায়ক এথেন্সের নাগরিক ও কৃষক ট্রাইগেয়ুস গ্রিকদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বন্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি শান্তির দেবীকে উদ্ধার করতে একটি গুবরে পোকার পিঠে চড়ে জিউসের দরবারে হাজির হন। ট্রাইগেয়ুসের এই দুঃসাহসী অভিযাত্রা সাধারণ গ্রিক জনগণের শান্তিকামী মনেরই প্রতিফলন, যারা যুদ্ধের কারণে অনাহারে ও দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছিল।

ঐক্যের ডাক ও শান্তির উদ্ধার: ট্রাইগেয়ুস গ্রিসের সকল কৃষক, বণিক, মজুর এবং কারিগরদের আহ্বান জানান শান্তির দেবীকে গর্ত থেকে টেনে তোলার জন্য। এরিস্টফেনিস এখানে দেখিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, শেষ পর্যন্ত চাষিকুলই শান্তির দেবীকে উদ্ধার করতে সফল হয়, যা নির্দেশ করে যে কৃষিনির্ভর গ্রিক সমাজের জন্য শান্তি কতটা অপরিহার্য ছিল।

যুদ্ধবাজ নেতাদের সমালোচনা: এরিস্টফেনিস তার নাটকে তৎকালীন এথেন্সের উদ্ধত ও অসংযমী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করেছেন। 'শান্তি' নাটকে দেখা যায়, শান্তি স্থাপনের সুযোগ বারবার আসলেও স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদদের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তিনি সমরাস্ত্র নির্মাতাদেরও কটাক্ষ করেছেন, কারণ শান্তি স্থাপিত হলে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়।

শান্তির সুফল ও জীবনের জয়গান: শান্তির দেবী মর্ত্যে ফিরে এলে তার সাথে আগমন ঘটে 'ওপোরা' (শস্য তোলার প্রতিভূ) ও 'থিওরিয়া' (উৎসবের প্রতিভূ)-র। নাটকের সমাপ্তি ঘটে ভোজসভা, নৃত্যগীত, মদ্যপান এবং কৃষি কাজে পুনরায় মনোনিবেশ করার এক উৎসবমুখর পরিবেশের মধ্য দিয়ে। এরিস্টফেনিস যুদ্ধের বীরত্বের চেয়ে সাধারণ মানুষের সুখী ও উৎসবময় পারিবারিক জীবনকেই শ্রেষ্ঠ বলে তুলে ধরেছেন।

পরিশেষে বলা যায়, এরিস্টফেনিস তার হাস্যরস ও বিদ্রূপের মাধ্যমে গ্রিকদের যুদ্ধমত্ততাকে আক্রমণ করেছেন এবং 'শান্তি' নাটকের মাধ্যমে এই বার্তাই দিয়েছেন যে, যুদ্ধ কেবল ধ্বংস ও মহামারী বয়ে আনে, আর প্রকৃত মানবকল্যাণ নিহিত রয়েছে শান্তিময় কৃষিভিত্তিক জীবনের জয়গানে।

 

 

শিরোনাম: অ্যারিস্টোফেনিসের 'শান্তি': যুদ্ধ-বিরোধী মনোভাবের এক অনন্য দলিল।

লেখা: মুহাম্মদ আল ইমরান (Muhammad Al Emran)

শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।