ইউরিপিদিস রচিত 'ট্রয়ের রমনীরা' নাটক - মুহাম্মদ আল ইমরান

 


ইউরিপিদিস রচিত এবং মোবাশ্বের আলী অনূদিত 'ট্রয়ের রমনীরা' নাটকটি মূলত যুদ্ধের ভয়াবহতা, ধ্বংসলীলা এবং বিজিত পক্ষের নারীদের চরম লাঞ্ছনা ও দুঃখ-বেদনার এক মর্মস্পর্শী চিত্র। নিচে নাটকটির সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো:

 

১. যুদ্ধের পরিণতি ও দেবতাদের ক্ষোভ: দীর্ঘ দশ বছরের যুদ্ধের পর ট্রয় নগরী এখন গ্রিকদের দখলে এবং তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নাটকের শুরুতে সমুদ্রদেবতা পসিডন ট্রয়ের করুণ অবস্থায় শোক প্রকাশ করেন। দেবী এথেনা, যিনি আগে গ্রিকদের পক্ষে ছিলেন, এখন গ্রিকদের দ্বারা তার মন্দিরের অবমাননার কারণে তাদের ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে পসিডনের সাথে হাত মেলান যাতে গ্রিক সেনারা দেশে ফেরার পথে সমুদ্রের ঝড়ে ধ্বংস হয়ে যায়।

২. বন্দিনী নারীদের ভাগ্য নির্ধারণ: ট্রয়ের রাজমাতা ও প্রাক্তন রানী হেকুবা তার সন্তান ও দেশ হারিয়ে এক নিঃস্ব ও অসহায় বৃদ্ধা হিসেবে আবির্ভূত হন। গ্রিক দূত টেলথিবিয়াস এসে সংবাদ দেন যে ট্রয়ের নারীদের লটারির মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রিক বীরদের দাসী হিসেবে বণ্টন করা হয়েছে। রানী হেকুবা খবর পান যে তার কন্যা ক্যাসান্দ্রাকে রাজা আগামেমনন তার রক্ষিতা হিসেবে নিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, হেকুবার আর এক কন্যা পলিক্সেনাকে অ্যাকিলিসের সমাধিতে উৎসর্গ (হত্যা) করা হয়েছে।

৩. ক্যাসান্দ্রার উন্মাদনা ও হেকুবার শোক: ক্যাসান্দ্রা দিব্যদৃষ্টিসম্পন্ন হলেও মানুষ তাকে উন্মাদ মনে করে। তিনি তার আগাম বিয়ের কথা বলে নাচতে শুরু করেন এবং ভবিষ্যৎবাণী করেন যে তার এই গ্রিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত আগামেমননের ধ্বংস ডেকে আনবে। হেকুবা নিজের ভাগ্য দেখে হতাশ হন কারণ তাকে ধূর্ত রাজা ওডিসেরাসের দাসী হতে হবে।

৪. অ্যান্ড্রোমাকি ও শিশু এসটিয়ানাক্সের ট্র্যাজেডি: হেক্টরের বিধবা পত্নী অ্যান্ড্রোমাকিকে একিলিসের পুত্র নিওপটোলেমাস দাসী হিসেবে গ্রহণ করে। গ্রিকরা সিদ্ধান্ত নেয় যে হেক্টরের শিশুপুত্র এসটিয়ানাক্স যদি বড় হয় তবে সে আবার ট্রয় গড়ে তুলবে এবং প্রতিশোধ নেবে, তাই তাকে ট্রয়ের প্রাচীর থেকে নিচে ফেলে হত্যা করার নিষ্ঠুর নির্দেশ দেওয়া হয়। অ্যান্ড্রোমাকি তার বুক ফাটা আর্তনাদ নিয়ে গ্রিসের পথে রওনা হন এবং সন্তান হত্যার দায় গ্রিকদের ওপর চাপিয়ে দেন।

৫. হেলেনের বিচার: ট্রয় যুদ্ধের মূল কারণ হেলেনকে তার স্বামী মেনিলাসের সামনে আনা হয়। হেলেন তার কাজের জন্য দেবতাদের দোষারোপ করে ক্ষমা পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু হেকুবা জোরালো যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে হেলেন কেবল নিজের বিলাসিতা ও কামনার বশবর্তী হয়েই প্যারিসের সাথে পালিয়ে এসেছিলেন। মেনিলাস তাকে গ্রিসে নিয়ে গিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অঙ্গীকার করেন।

৬. চূড়ান্ত বিদায় ও ধ্বংস: দূত টেলথিবিয়াস হেক্টরের ঢালের ওপর রাখা শিশু এসটিয়ানাক্সের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ নিয়ে ফিরে আসেন। হেকুবা তার নাতির মৃতদেহ সৎকার করার সময় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী বিলাপ করেন। শেষে গ্রিক সেনারা ট্রয় নগরীতে আগুন ধরিয়ে দেয়। হেকুবা আগুনে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ দিতে চাইলেও তাকে বাধা দেওয়া হয়। জ্বলন্ত ট্রয় নগরীর ধোঁয়া আর আর্তনাদের মধ্য দিয়ে হেকুবা ও অন্য বন্দিনী নারীরা চিরতরে তাদের প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়ে গ্রিক জাহাজের দিকে এগিয়ে যান।

নাটকটি দেখায় যে যুদ্ধ কেবল বীরত্ব নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকে অগুনতি নারী ও শিশুর কান্নার ইতিহাস। ইউরিপিদিসের 'ট্রয়ের রমনীরা' নাটকটি মূলত যুদ্ধের বীরত্বগাথা নয়, বরং যুদ্ধের ফলে বিজিত পক্ষের নারীদের ওপর নেমে আসা চরম লাঞ্ছনা, বিচ্ছেদ এবং শোকের এক করুণ আখ্যান।

 

এই নাটকে নারীর দুঃখ গাঁথাকে কয়েকটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. মাতৃত্ব ও শোকের হাহাকার: নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র রাজমাতা হেকুবা যুদ্ধের ফলে তার স্বামী প্রিয়াম এবং অসংখ্য সন্তানকে হারিয়েছেন। তার চোখের সামনেই তার কন্যা পলিক্সেনাকে উৎসর্গ করা হয় এবং হেক্টরের শিশুপুত্র এসটিয়ানাক্সকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। একজন মা এবং দাদী হিসেবে এই অপত্য স্নেহের বিনাশ তার জীবনকে গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে।

২. সম্ভ্রম ও স্বাধীনতার অবমাননা: ট্রয়ের রাজকীয় নারীরা যারা একসময় সম্মানের সাথে বাস করতেন, তাদের গ্রিক বীরদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে দাসী হিসেবে ভাগ করে দেওয়া হয়।

  • হেকুবা, যিনি ট্রয়ের রানী ছিলেন, তাকে ধূর্ত ওডিসেরাসের দাসী হতে হয়।
  • ক্যাসান্দ্রা, যিনি অ্যাপোলোর পবিত্র কুমারী ছিলেন, তাকে রাজা আগামেমনন তার রক্ষিতা হিসেবে গ্রহণ করেন, যা তার ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত পবিত্রতার চরম অবমাননা।
  • অ্যান্ড্রোমাকি, হেক্টরের বীরত্বের অহংকার যার সাথে জড়িয়ে ছিল, তাকে একিলিসের পুত্রের দাসী হিসেবে গ্রিসে যেতে হয়।

৩. ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হারানোর বেদনা: অ্যান্ড্রোমাকির শিশুপুত্র এসটিয়ানাক্সকে যখন ট্রয়ের প্রাচীর থেকে নিচে ফেলে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন তা কেবল একটি শিশুর মৃত্যু নয়, বরং ট্রয়ের ভবিষ্যৎ বংশপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত নিষ্ঠুরতা হিসেবে প্রকাশ পায়। সন্তানের এই অকালমৃত্যু অ্যান্ড্রোমাকির মাতৃত্বকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয়।

৪. মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছেদ ও অনিশ্চয়তা: নাটকের শেষে যখন ট্রয় নগরীতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, তখন বন্দিনী নারীরা তাদের প্রিয় জন্মভূমিকে শেষবারের মতো দেখতে দেখতে জাহাজে উঠতে বাধ্য হন। তাদের জন্য অপেক্ষা করছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, যেখানে তারা নিজেদের পরিচয় হারিয়ে কেবল 'বিজেতার সম্পত্তি' হিসেবে বেঁচে থাকবেন।

৫. হেলেন ও নারীর অন্য রূপ: নাটকের একপর্যায়ে হেলেনকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়। সেখানে হেকুবা যুক্তি দেখান যে, হেলেন তার নিজের লালসার কারণে এই ধ্বংসলীলা ডেকে এনেছেন। এটি দেখায় যে যুদ্ধের কারণে কেবল সাধারণ নারীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং হেলেনের মতো নারীরাও ঘৃণা ও অপরাধবোধের শিকারে পরিণত হন।

 

পরিশেষে বলা যায়, 'ট্রয়ের রমনীরা' নাটকটি দেখায় যে যুদ্ধের আসল শিকার পুরুষ নয়, বরং নারী ও শিশুরা, যাদের কোনো অপরাধ ছাড়াই আজীবন এই শোক ও দাসত্বের গ্লানি বহন করতে হয়। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক নাটক নয়, বরং সর্বকালের শান্তিকামী মানুষের কাছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক জোরালো প্রতিবাদ।


শিরোনাম: ইউরিপিদিস রচিত 'ট্রয়ের রমনীরা' নাটক। 

লেখা: মুহাম্মদ আল ইমরান (Muhammad Al Emran)

শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।